SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

বাঙালির ভূতচর্চা, পর্ব ২: ‘মারা গিয়েও’ ফিরে এলেন স্থিরসৌদামিনী

মে ২২, ২০১৭
Share it on
বেশ কিছুক্ষণ পরে স্থিরসৌদামিনীর নিঃসাড় শরীর থেকে তাঁর গলা শোনা গেল। তিনি বললেন— দাদা, আমি ঘুমোইনি, মারা গেছি।

প্রেতচর্চার ব্যাপারে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য মননের পার্থক্য পরিষ্কার দেখা যায়। ইউরোপিয়ানরা পরলোকের দিকে তাকিয়েছেন জ্ঞানের জন্য— মৃতব্যক্তির আত্মা জীবিতদের জিজ্ঞাসার সঠিক উত্তর দিতে পারে কি না জানতে। বাঙালি প্রেতচক্রের আয়োজন করতে শুরু করে প্রধানত অবসর বিনোদন আর মনোরঞ্জনের জন্য। সেই কারণেই হয়তো ব্যাপারটার গভীরে যাওয়ার চেষ্টা হতো না, আর সেই থেকেই অবিশ্বাসের শুরু যার ফলে বিংশ শতাব্দীতে সমগ্র প্রেতচর্চাই শিক্ষিত বাঙালি সমাজের কাছে একটা উপহাসের বিষয় হয়ে গিয়েছে। এরই মধ্যে ব্যতিক্রমী রাজকৃষ্ণ মিত্র, প্যারীচাঁদ মিত্রের মতো কিছু বাঙালি, যাঁরা পরলোক সম্পর্কে চর্চা একটা বিশ্বাসের জায়গায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন কারণ, তাঁদের কাছে পরলোকের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে মৃত প্রিয়জনটিকে সময়ে-অসময়ে কাছে পাওয়ার একমাত্র উপায় ছিল প্ল্যানচেট। এর এক অনন্যসাধারণ উদাহরণ যশোর জেলার পালুয়া মাগুরা (বর্তমানে অমৃতবাজার) গ্রামের বর্ধিষ্ণু ঘোষ পরিবারের ইতিবৃত্ত।

১৮৬২ সালে পরিণত বয়সে পরিবারের প্রধান হরিনারায়ণ ঘোষ দেহরক্ষা করেন। কিন্তু সেই শোক সামলে ওঠার আগেই তাঁদের পরিবারে আর একটি অঘটন ঘটে— হরিনারায়ণের কনিষ্ঠ পুত্র তরুণ হীরালাল আত্মহত্যা করেন। এই দ্বৈত আঘাতে সকলেই বিমূঢ় হয়ে পড়েন। হরিনারায়ণের বড় ছেলে শিশিরকুমারের বয়স তখন বাইশ বছর, গোটা পরিবারের দায়িত্ব তাঁরই ওপরে এসে পড়ল। এর পরেই আরো এক অভাবনীয় ব্যাপার ঘটল। কিভাবে তঁদের পারিবারিক ব্যাবসাপত্র চালাবেন, এবং শোকতপ্ত বাড়ীর সকলকে সামলে রাখবেন, সেই রাস্তা খুঁজতে গিয়ে শিশিরকুমারের ধারণা হয়, তাঁর সমস্যার সমাধান পরলোকগত প্রিয়জনরাই করতে পারবেন, জীবিত মানুষের কাছে গিয়ে লাভ হবে না। খোঁজ করতে করতে তিনি পৌঁছে গেলেন কলকাতায় বেঙ্গল লাইব্রেরিতে, তখনকার খ্যাতনামা প্রেততত্নবিদ প্যারীচাঁদ মিত্রের পদপ্রান্তে। মিত্রমহাশয় তাঁকে বুঝিয়ে দিলেন, ঠিক কী কী করলে শিশিরকুমার জীবনে চলার সঠিক পথের দিশা পেতে পারেন।

প্রশিক্ষিত হয়ে শিশিরকুমার নিজেদের পৈতৃক বাড়ি পলুয়া মাগুরায় ফিরে এসে বাড়ির সদস্যদের নিয়ে প্রেতচক্রের আয়োজন করেন। একাধিকবার ব্যর্থ হওয়ার পরে অবশেষে ঘোষ পরিবার ১৮৬৪ সালে হীরালালের আত্মাকে চক্রে নামাতে সমর্থ হয় এবং তাঁর নির্দেশমতো প্রায় প্রত্যহ বাড়িতে চক্র বসাতে শুরু করে। কিছুদিনের মধ্যেই বোঝা গেল, পরিবারের অনেক সদস্যেরই কোনও-না-কোনও অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা রয়েছে, এই চর্চার ফলে যা বিকশিত হয়ে উঠতে শুরু করেছিল। দেখা গেল, শিশিরকুমার নিজে অলৌকিকভাবে রোগ সারাতে পারেন, যাকে ইংরেজীতে বলে ‘Healer’। তা ছাড়া তিনি লোককে সম্মোহন বা হিপনোটাইজও করতে পারতেন। তাঁর ভাই মতিলাল ভাল মিডিয়াম ছিলেন, আর এক ভাই হেমন্তকুমার স্বলিখন বা  Automatic writing-এর ক্ষমতা রাখতেন। কিন্তু এঁদের সকলের চেয়ে বেশি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারিণী ছিলেন শিশিরকুমারের ছোট বোন স্থিরসৌদামিনী  তিনি মিডিয়াম অসাধারণ তো ছিলেনই, তা ছাড়া ভবিষ্যৎ দেখতে পেতেন, সূক্ষ্ণশরীরে ভ্রমণও করতে পারতেন। চক্রে বসতে বসতে একটি আত্মা, নাম তার হরিদাস, স্থিরসৌদামিনীর বিশেষ বাধ্য হয়ে গিয়েছিল। সে-ই অন্যন্য আত্মাদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ করিয়ে দিত। এঁদের প্রেততত্ত্বের ভাষায় বলা হয় ‘কন্ট্রোল’। হরিদাস নাকি ভালো কীর্তনও গাইতে পারত।

স্থিরসৌদামিনীর নিজের জীবনের অনেক ঘটনা গল্পের চেয়েও রোমাঞ্চকর। একবার শিশিরকুমার ভাবলেন, বোনকে সূক্ষশরীরে ওপারে পাঠিয়ে অন্য ভুবনের খবর আনাবেন। তিনি চক্রে বসে স্থিরসৌদামিনীকে পূর্ণ সম্মোহিত করলেন, ধীরে ধীরে স্থিরসৌদামিনীর জ্ঞান লুপ্ত হয়ে গেল, তাঁর শরীর ঠান্ডা হতে শুরু করলো, নাড়ী, নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস, হৃদস্পন্দন— সব থেমে গেল। তখন ভয় পেয়ে গিয়ে শিশিরকুমার তাঁর বোনকে জাগাবার চেষ্টা করতে লাগলেন, কিন্তু অনেকক্ষণ পর্য্যন্ত কোনও ফল হল না। শিশিরকুমার তবুও চেষ্টা করে যেতে লাগলেন। বেশ কিছুক্ষণ পরে স্থিরসৌদামিনীর নিঃসাড় শরীর থেকে তাঁর গলা শোনা গেল। তিনি বললেন— দাদা, আমি ঘুমোইনি, মারা গেছি। এ জায়গা বড় সুন্দর, আমি আর ফিরতে চাই না। অনেক কাকুতি মিনতি, সাধ্য-সাধনার পরে তাঁর মন গলল, তিনি পৃথিবীতে ফিরে এলেন। শিশিরকুমার আর কখনও বোনকে সম্মোহিত করার চেষ্টা করেননি, কেন না স্থিরসৌদামিনী বলেই দিয়েছিলেন যে, আর একবার ওই জগতে পা দিলে তিনি আর পৃথিবীতে ফিরবেন না।

প্রেতচর্চা শুরু করার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই শিশিরকুমার ঘোষ উনিশ শতকের এক স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন। তিনি একাধারে সাংবাদিক, সম্পাদক, দেশপ্রেমিক ও মহাবৈষ্ণব রূপে বঙ্গসমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। মাত্র আঠাশ বছর বয়সে তিনি বাংলা দৈনিক 'অমৃতবাজার পত্রিকা' স্থাপন করেন (১৮৬৮)। কোনও ভারতীয় ভাষায় তখন দৈনিক সংবাদপত্র প্রকাশের চলনই ছিল না। পরে রাজরোষ এড়াবার জন্য রাতারাতি বাংলা কাগজটিকে ইংরেজিতে রূপান্তরিত করেছিলেন। একসময়ে অমৃতবাজার পত্রিকা দেশের জনপ্রিয় সংবাদপত্রগুলির অন্যতম ছিল। তাঁর লেখা চৈতন্যজীবনী ‘অমিয় নিমাই চরিত’ বাংলা ভক্তিসাহিত্যের এক মাইলফলক। এ সব কীর্তির সঙ্গে শিশিরকুমার তথা ঘোষ পরিবারের অবিস্মরণীয় অবদান হল বাংলার সর্বত্র প্ল্যানচেট ও প্রেতচর্চা ছড়িয়ে দেওয়া। তাঁরা তাঁদের বিচিত্র অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মর জন্য সংরক্ষণও করে যান। স্থিরসৌদামিনী ও শিশিরকুমারের ভাইপো মৃণালকান্তি তাঁদের পরলোকচর্চার অতি সুখপাঠ্য বিবরণ লিখে গিয়েছিলেন, সেগুলি ছাপাও হয়েছিল। দুঃখের বিষয় বই দু’টি এখন আর পাওয়া যায় না।

শিশিরকুমার তাঁর ব্যক্তিগত শোকের ক্ষুদ্র পরিসর থেকে বেরিয়ে এসে শোকবিজয়ের বার্তা সর্বসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছিলেন । ১৮৮০ সালের তিরিশে নভেম্বর তাঁর উদ্যোগে কলকাতার প্রথম প্রেততাত্ত্বিক সমিতি স্থাপিত হয়েছিল, নাম দেওয়া হয় United Association of Spiritualists । সেই সমিতির প্রতি রবিবার অধিবেশন বসতো। রাজকৃষ্ণ মিত্রও ততদিনে যশোর ছেড়ে কলকাতায় বসবাস শুরু করেছেন, তিনিও সমিতিতে যোগ দেওয়ার ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই আসর বেশ জমে উঠেছিল। সমিতির সাফল্য দেখে শিশিরকুমার উচ্চাশী হয়ে উঠে ১৯০৬সালে ইংল্যান্ডের SPR-এর ছায়ায় Calcutta Psychic Society স্থাপন করেন আর সেই সঙ্গে প্রেত, জন্মান্তর ইত্যাদি নিয়ে গবেষণায় উৎসাহ দিতে Hindu Spiritual Magazine নামে একটি মাসিক পত্রিকাও শুরু করেন। ভারতবর্ষে এ জাতীয় প্রয়াস এর আগে হয়নি । তিনি মাঝে মাঝে নিজের খরচে বিদেশ থেকে খ্যাতকীর্তি মিডিয়ামদের নিয়ে এসে তাঁদের দিয়ে শো করাতেন গৌড়জনকে প্রেততত্বে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে।

ভূত-আন্দোলন জমে উঠেছিল ভালই, কিন্তু ১৯১১ সালে শিশিরকুমারের মৃত্যুর পরে গোটা ব্যাপারটা থিতিয়ে যায়। তাঁর উত্তরাধিকারীরাও সংবাদপত্র ব্যবসা ও রাজনীতি নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন, তুচ্ছ ভূত-প্রেত তাঁদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারত না। তাঁর পুত্র তুষারকান্তির জীবনে কিছু অলৌকিক অভিজ্ঞতা ঘটেছিল। তাঁর এক দাদা মৃত্যুর পরে তুষারবাবুর কাছে এসে পারিবারিক কিছু পরামর্শও দিয়েছিলেন। তুষারকান্তি তাঁর জীবনের লৌকিক-অলৌকিক নানা কাহিনি 'বিচিত্র কাহিনী ' ও 'আরো বিচিত্র কাহিনী’ নামে দুটি বইতে লিখে গিয়েছিলেন, সে বইও এখন আর বাজারে দেখি না। এই বংশের বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে তুষারকান্তির পৌত্র তমালকান্তিকে দেখছি অলৌকিকে আগ্রহী, কিন্তু সে আগ্রহ ড্রইংরুমের চার দেওয়ালের মধ্যেই আবদ্ধ থাকে, পিতৃপুরুষের এই ঐতিহ্য সর্বসাধারণের মধ্যে প্রচার ও প্রসারের শ্রমটুকু স্বীকারে, কেন জানিনা, তাঁর প্রবল অনীহা ।

বাঙালির ভূতচর্চা এই ভাবেই শুরু হয়েছিল। বিংশ শতাব্দীতে এসে দেখতে পাই, বিখ্যাত অনেক বাঙালি শিশিরকুমারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ভূতের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছিলে । বিশেষ করে, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে ভূতের আনাগোনার কাহিনি বেশ রোমহর্ষক আর রবীন্দ্রনাথ তো শুধু লিখে নয়, প্ল্যানচেট করেও পাতার পর পাতা ভরিয়েছিলেন। সেই গল্প আগামী বারে বলব।

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -