SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

কবে থেকে শুরু হল নাগপঞ্চমী! মানুষের বন্ধু, না শত্রু সাপ, কী জানায় পুরাণ

অগস্ট ১৫, ২০১৮
Share it on
মানুষের সুখ-সমৃদ্ধির জন্য সত্যিই বোধ হয় সুদূর অতীতে নাগজাতিকে একদা উচ্ছেদ করা হয়েছিল, মানবিক ভাবেই হোক বা অমানবিক ভাবেই হোক৷

সভ্যতার আদি ও মধ্যযুগের মানুষের, বিশেষ করে আমাদের মতো ভারতীয় উপমহাদেশের বাসিন্দাদের, প্রকৃতি ও পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে নিবিড় যোগ ছিল৷ প্রকৃতি বলতে আমি গাছপালা, পশু-পাখি, জলাশয়, নদ-নদী, সমুদ্র— এই সব কিছুর কথাই বলছি৷ আমরা যত আধুনিক হতে শুরু করলাম, নগরায়নের দিকে এগোতে লাগলাম, এই যোগও ক্ষীণ হতে শুরু করল আর যে প্রাণীকুল এক সময়ে সব থেকে কাছে ছিল, তারাই বোধ হয় সবচেয়ে দূরে সরে গেল৷ প্রাণীটির নাম সাপ, অন্ধকারে যাদের নাম নিতে আজও গ্রামাঞ্চলের মানুষ ভয় পান৷ 

আমাদের পুরোনো সাহিত্য-সংস্কৃতিতে কিন্তু সর্পঘনিষ্ঠতার যথেষ্ট নিদর্শন রয়েছে৷ ‘মহাভারত’ ও ‘ভাগবত’-এ কৃষ্ণকে যেমন বিষ্ণুর অবতার বলা হয় তেমনই কৃষ্ণ অগ্রজ বলরামকে বলা হচ্ছে শেষনাগ অর্থাৎ বাসুকীর অবতার৷ পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, বিষ্ণুলোকে ক্ষীরোদসাগরে অনন্তনাগের কোলে নারায়ণ অধিষ্ঠান করেন৷ সম্প্রীতির নিদর্শন আরও আছে— প্রাচীন সাহিত্যে দেবাদিদেব মহাদেব, যিনি কৈলাসবাসী, অর্থাৎ পাহাড়ের দেশের অধিবাসী, তাঁর রূপ বর্ণনা করতে গিয়ে ঋষিরা বলছেন, তাঁর গলায় সাপ জড়ানো, মানে তিনি সাপের মাফলার ব্যবহার করে থাকেন৷ ‘মহাভারত’-এই পাচ্ছি বিষ্ণুর বাহন গরুড় সাপের চিরবৈরী, অথচ গরুড়ের বস, স্বয়ং নারায়ণ অনন্তনাগের পালঙ্কে নিশ্চিন্তে নিদ্রা যান৷


অনন্তশয়ানে নারায়ণ, পুরনো লিথোগ্রাফ। সূত্র: উইকিপিডিয়া

দ্বাপরযুগে এসে ‘মহাভারত’-এর আদিপর্বে সাপ ও মানুষের সম্পর্ক নিয়ে একটা উপাখ্যান পাচ্ছি— কুরুপাণ্ডবের বাল্যকালে, ভীমের পরাক্রমে ঈর্ষান্বিত দুর্যোধন তাঁকে বিষাক্ত মিষ্টান্ন খাইয়ে জলে ফেলে দিয়েছিলেন৷ কালকূটে আচ্ছন্ন ভীমসেন জলের তলায় নাগরাজ্যে গিয়ে পড়েন৷ সেখানে অসংখ্য বিষধর সাপ তাঁকে দংশন করায় বিষে বিষক্ষয় হয়ে মধ্যম পাণ্ডব নিজ শক্তি ফিরে পান এবং তখন তাঁর দাপটে অতিষ্ঠ হয়ে নাগকুল তাঁকে সর্পরাজ বাসুকীর কাছে নিয়ে যায়৷ বাসুকী ভীমের পরিচয় জানতে পেরে পরম প্রীত হয়ে স্বজাতির কাছে ভীমকে নিজের দৌহিত্র বলে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন এবং বিশেষ আপ্যায়ন করে ভীমের সামনে অমৃতের ভাঁড়ারঘর খুলে দেন৷ ভীম আট চৌবাচ্চা, মতান্তরে কুম্ভ, অমৃত পান করে অযুত হস্তীর বল লাভ করেছিলেন৷ উপযুক্ত বিশ্রামের পরে নতুন জামাকাপড় পরিয়ে বাসুকী তাঁকে মর্ত্যলোকে পাঠিয়ে দেন৷ 

‘মহাভারত’-এর এই উপাখ্যান থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, মানুষ ও নাগের মধ্যে সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ ছিল৷ এই মহাকাব্যেই আরও একটু এগিয়ে আদিপর্বেই পাচ্ছি আর একটা কাহিনি— তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন ফ্যামিলি কোড লংঘন করার জন্য দ্বাদশবর্ষকালীন বনবাস ও ব্রহ্মচর্য স্বীকার করে পরিব্রাজনে বেরিয়ে হরিদ্বারে গঙ্গাস্নান করার সময়ে নাগরাজকন্যা উলূপী তাঁকে দেখতে পান এবং অর্জুনের রূপে মোহিত হয়ে তাঁকে পাতালে নিয়ে গিয়ে বোঝান যে, ব্রহ্মচর্য কেবলমাত্র দ্রৌপদীর জন্য, এখানে থোড়িসি বেবফাই করে ফেললে তাঁর ব্রতভঙ্গ হবে না৷ অর্জুনকে খুব বেশি বোঝানোর দরকার হয়নি, তিনি সে রাতটা উলূপীর সঙ্গে কাটিয়ে পরের দিন সকালে আবার হরিদ্বার ফিরে যান, উলূপী ততদূর গিয়ে তাঁকে টা টা  বাই বাই করে এসেছিলেন৷ কোনও বিবাহ অনুষ্ঠান হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে মহাভারতকার নীরব৷ কিন্তু উলূপী ঘোর আধুনিকা ছিলেন, মাত্র এক রাতের শয্যাসুখের জন্য কুমারী মা হতেও রাজী ছিলেন৷ এই মিলনের ফসল অর্জুনপুত্র ইরাবান, যিনি পিতার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন, এমনকী কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডবপক্ষে লড়ে প্রাণও দিয়েছিলেন৷


বলরামের মৃত্যু, পুরনো লিথোগ্রাফ। সূত্র: উইকিপিডিয়া

অর্জুনের পরবর্তী গন্তব্য ছিল উত্তরপূর্ব ভারতের মণিপুর, যে অঞ্চলের অনেক লোককথায় আজও সাপ ও মানুষের মধ্যে গভীর সম্প্রীতির কাহিনী বর্ণিত রয়েছে৷ ‘মহাভারত’-এর শেষভাগে, যদুবংশ ধ্বংসের সময় দ্বারকায় বটবৃক্ষের নীচে যোগসমাহিত বলরামের মুখ দিয়ে এক সহস্রফণা রক্তবর্ণ মহাসর্প বেরিয়ে এসে সমুদ্রে গিয়ে পড়ে আর সেই সঙ্গেই বলরামের জীবলীলাও শেষ হয়ে যায়৷

অথচ এযুগে সাপ মানুষের শত্রু, তাকে দেখলে আমরা ভয় পাই, পারলেই মেরে ফেলি, যদিও সাপের চামড়া দিয়ে তৈরি ব্যাগ জুতো অনেক সম্ভান্ত মহিলার কাছে ফ্যাশন স্টেটমেন্ট৷ সাপের বিষ ব্যবহার করে নানা রকমের ওষুধ তৈরি হয় বলেও শুনেছি৷ সাপের সঙ্গে যে প্রীতির সম্পর্ক ছিল এককালে, তার প্রমাণ পাই লোককথায় ও লোকনৃত্যে, যেখানে সর্পনৃত্য খুব প্রচলিত৷ ধ্রুপদী নৃত্যশৈলীতেও নাগনৃত্যের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে৷ এছাড়া সাধন জগতে বলা হয়, সাধনার প্রথম সোপান কুন্ডলিনী জাগ্রত করা— তন্ত্রমতে কুন্ডলিনী একটি সাপের মতো বস্তু, যা আমাদের শিরদাঁড়ার নিম্নভাগে নিদ্রিত থাকে, যোগবলে তাকে জাগিয়ে তুলতে হয়৷


পরীক্ষিতের মৃত্যু, মুঘল পুথিচিত্রণ, সূত্র: উইকিপিডিয়া

কিন্তু ছোটবেলা থেকে শিখে এসেছি সাপ খলচরিত্র, সাপ আমাদের শত্রু৷ এই সব পরষ্পর-বিরোধী তথ্য পড়তে পড়তে কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে আমি আমার এক পুরাতাত্ত্বিক-তথা-ভাষাবিদ বন্ধুর শরণ নিয়েছিলাম৷ তিনি আমাকে বোঝালেন যে, সাপ বলতে শুধুমাত্র সরীসৃপজাতিকে ভেবে নিও না, তা হলে ভুল করবে৷ সাপের সবচেয়ে পরিচিত প্রতিশব্দ হল নাগ৷ এই নাগেরা সম্ভবত ছিল এক পরাক্রান্ত প্রাচীন উপজাতি, নবাগত আর্যদের (পড়ুন পাণ্ডব) সঙ্গে তাদের ভালবাসা-মন্দবাসা দুই-ই চলত৷ ভালবাসার গল্প এতক্ষণ বললাম, ঝগড়া শুরু হল পরবর্তীকালে এবং বৈরিতা তুঙ্গস্পর্শ করেছিল পাণ্ডবপৌত্র পরীক্ষিতের সময়ে, যখন নানা কৌশলে তক্ষকনাগ পরীক্ষিতকে হত্যা করে৷ প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য পরীক্ষিতের ছেলে জন্মেজয় সর্পবধ যজ্ঞ শুরু করেন৷ সাপের বংশ লুপ্ত হতে চলেছে দেখে জরৎকারু মুনির পুত্র আস্তিক কোনওমতে তাঁকে নিরস্ত করেন৷ 

যেদিন সর্পবধ যজ্ঞ বন্ধ হয়েছিল, সেই দিনটি এখনও ‘নাগপঞ্চমী’ বলে সমাদৃত৷ সেই দিনটিতে সাপবংশ বিশেষভাবে পূজিত হলেও নাগজাতির প্রতিপত্তি কিন্তু জন্মেজয়ের যজ্ঞের ফলে মোটামুটি শেষ হয়ে গিয়েছিল৷ যারা কোনওমতে টিকে গিয়েছিল, তারা আর্যদের অত্যাচারে ভিটে-মাটি ছেড়ে পাহাড়ে জঙ্গলে লুকিয়ে প্রাণে বেঁচেছিল৷ বন্ধু আমাকে জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের অভিধান খুলে দেখিয়ে দিলেন, ‘নাগ’ শব্দের ব্যুৎপত্তি হল ‘নগ’ (পর্বত বা বৃক্ষ)+অ প্রত্যয়৷ ভাবার্থে, অর্থাৎ সহজ ভাষায়, যারা পাহাড়ে বা গাছের কোটরে বাস করে৷ হয়তো এদের টোটেম ছিল সাপ, তাই কালক্রমে দু’টি শব্দের মানে এক হয়ে গিয়েছে৷ হয়তো উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের নাগা উপজাতি এদের থেকেই উদ্ভুত৷ এখনও ভারতের বহু এলাকায় নাগ পদবী প্রচলিত আছে৷ বন্ধু আমাকে সচেতন করে দিলেন ‘নাগ’ শব্দের সঙ্গে নাগা সন্ন্যাসীদের যেন গুলিয়ে না ফেলি৷ নাগাসন্ন্যাসী মানে একেবারেই আলাদা, তাদের সঙ্গে সরীসৃপের কোন সম্পর্ক নেই৷ সেখানে নাগা মানে ‘নঙ্গা’ অথবা নগ্নের অপভ্রংশ৷ ‘নাগ’ শব্দের আর একটি অর্থ হল হাতি, তবে এর ব্যবহার তুলনায় সীমিত৷ সাপের সঙ্গে হাতির বোধহয় একমাত্র সাদৃশ্য হল দু’জনেরই মাথায় মণি পাওয়া যায় বলে প্রবাদ আছে৷


জন্মেজয়ের সর্পযজ্ঞ, পুরনো লিথোগ্রাফ। সূত্র: উইকিপিডিয়া

বন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমাদের প্রতিবেশী দেশ নেপালের একটি উপকথা মনে পড়ে গেল৷ সুদূর সত্যযুগের কাহিনি৷ আকাশছোঁয়া হিমালয় পর্বতমালার পাদদেশে ছিল এক বহু যোজনবিস্তৃত জলাশয়৷ সেই জলাশয়ের অধীশ্বর ছিল নাগেরা, তারা তাদের অতুল ঐশ্বর্য নিয়ে সেই জলাশয়ের নীচে বাস করত, তাই এর নাম ছিল নাগহ্রদ৷ সেই পবিত্র ভূখণ্ডে বহু সিদ্ধপুরুষ যাতায়াত করতেন৷ একদিন সেখানে এলেন সপ্ত আদিবুদ্ধের প্রথম বুদ্ধ মহামুনি বিপশ্বীন৷ তিনি একটি পদ্মবীজ জলাশয়ের কেন্দ্রে নিক্ষেপ করে বলে গেলেন— যেদিন এই ফুল ফুটবে, সেদিন স্বয়ম্ভু বুদ্ধ এখানে এক অগ্নিশিখারূপে দেখা দেবেন৷ তিনি আরও ভবিষ্যদ্বাণী করলেন যে, চিনদেশ থেকে বোধিসত্ত্ব মঞ্জুশ্রী এসে এই এলাকার আমূল সংস্কার করবেন৷ (জানিয়ে রাখি, এই বোধিসত্ত্বটি এক দাপুটে পুরুষপুঙ্গব ছিলেন, যদিও মঞ্জুশ্রী নামখানা শুনে আমরা তাঁকে স্ত্রীলিঙ্গ মনে করি) 

আরও কয়েক শতাব্দী পরে বোধিসত্ত্ব এলেন, তাঁর এক হাতে প্রজ্ঞাপুস্তক, অন্যহাতে মহাপরাক্রমী চন্দ্রহাস তরবারি ৷ চারদিক ঘুরে দেখে তাঁর মনে হল, পবিত্র শিখার প্রকৃত উপাসনার জন্য হ্রদের জল নিষ্কাশন করতে হবে৷ তিনি দশ দিক কাঁপিয়ে হুঙ্কার ছেড়ে তাঁর তরবারি দিয়ে আশপাশের পাহাড়গুলিকে দ্বিখণ্ডিত করে দিলেন৷ হু হু করে জলাশয়ের জল বেরিয়ে চলে গেল ভারতভূমির দিকে৷


সর্প-বেষ্টিত বুদ্ধ, সূত্র: উইকিপিডিয়া

বিপন্ন নাগেরা মঞ্জুশ্রীরই শরণ নিল৷ তিনি বললেন— বৃহত্তর কল্যাণের জন্য তাদের এটুকু ক্ষতি মেনে নিতে হবে, তবে তারা যেন এলাকা ছেড়ে চলে না যায়, তাদের উপযুক্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা তিনি করবেন৷ বোধিসত্ত্ব জানতেন, নাগেরা বৃষ্টি, ধনরত্ন ও আরও অনেক কিছুর রহস্য জানে, তাদের চটালে ওখানে ধর্মসংস্থাপনা সম্ভব হবে না৷ মঞ্জুশ্রীর পরামর্শে নাগেরা সপরিজন উঠে এল পাশের তাওদা জলাশয়ে, সেখানে তারা নাকি আজও পরমসুখে বাস করছে৷ জল সরে যাওয়ার পরে গোটা জায়গাটা একটি সুন্দর উপত্যকা হয়ে উঠল৷ সেখানে একটি সুন্দর শহরও গড়ে উঠল৷ প্রথমে একে বলা হতো মঞ্জুপত্তনম্, তারপরে শহরের সুদৃশ্য কাঠের প্রাসাদগুলির জন্য ‘কাষ্ঠমণ্ডপম্’ বলে জায়গাটি পরিচিতি পেল, কালক্রমে কাষ্ঠমন্ডপম্ থেকে কাঠমান্ডু নামটি পাকাপাকি হয়ে গেল৷ ইতিহাস বলছে, কাঠমান্ডু উপত্যকা সৃষ্টি হয়েছিল খ্রিস্টজন্মের প্রায় এক লক্ষ বছর আগে৷

 
পশুপতিনাথ মন্দির, কাঠমান্ডু। ছবি: শাটারস্টক

এই কাহিনি থেকে মনে হয় মানুষের সুখ-সমৃদ্ধির জন্য সত্যিই বোধ হয় সুদূর অতীতে নাগজাতিকে একদা উচ্ছেদ করা হয়েছিল, মানবিক ভাবেই হোক বা অমানবিক ভাবেই হোক৷ সেই দুঃখের স্মৃতি এখনও আমাদের অরণ্যপর্বতে ছড়ানো রয়েছে৷ আর সেই থেকেই হয়তো সাপের মানুষের প্রতি এত ঘৃণা, এত হিংস্রতা৷ 

(ক্রমশ)

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -