SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

পুজো-পার্বণ-ব্রতকথা: দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিমাসেই পালিত হয় শ্রীগণেশের ব্রত

নভেম্বর ৪, ২০১৬
Share it on
শুধুমাত্র ভাদ্রমাসের শুক্লচতুর্থী নয়, শাস্ত্রমতে শ্রীগণেশের পূজা করা উচিত প্রতিমাসেই। হিন্দু পাঁজি অনুযায়ী প্রত্যেক মাসেই দু’টি তিথি নির্দিষ্ট থাকে এই ব্রতপালনের জন্য।

হিন্দুধর্মে শ্রীগণেশের গুরুত্ব অপরিসীম। শিব পুরাণের সেই গল্পটি ধরা যাক, যেখানে বলা হয়েছে যে গজসুরের পাকস্থলী থেকে মহাদেবের নির্গমনের খবরটি পেয়ে দেবী পার্বতী বিশেষ স্নানের আয়োজন করছিলেন। কিন্তু সেই সময় তাঁর স্নানাগারের সামনে পাহারা দেওয়ার জন্য নন্দী উপস্থিত ছিলেন না। দেবী সেই সময়ে সারা গায়ে হলুদের প্রলেপ দিয়েছিলেন। সেই প্রলেপ দিয়েই তিনি তৈরি করেন শ্রীগণেশকে এবং বসিয়ে যান পাহারায়। গল্পের বাকিটা সকলেরই জানা। এর পর শিবের সঙ্গে যুদ্ধ এবং গণেশের মস্তক ছেদন। সব দেখেশুনে দেবী পার্বতী এতটাই ক্রুদ্ধ হন যে, সমগ্র সৃষ্টিই ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ব্রহ্মার মধ্যস্থতায় ঠিক হয়, দু’টি শর্তে তিনি শান্ত হবেন— এক, তাঁর ছেলেকে প্রাণ ফিরিয়ে দিতে হবে এবং দুই, আবহমান কাল ধরে সমস্ত দেবতার পূজার আগে প্রথম পূজা পাবেন শ্রীগণেশ।    

বৌদ্ধ গণেশ

শ্রীগণেশ কিন্তু শুধুই হিন্দু দেবতা নন, বৌদ্ধ এবং জৈন পুরাণ-শাস্ত্রেও তাঁর উল্লেখ রয়েছে। ইতিহাস বলে, মোটামুটিভাবে গুপ্তযুগে, চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীর মধ্যেই উপমহাদেশের বিস্তৃত অঞ্চলে তাঁর পূজার প্রচলন শুরু হয়। উদ্ভব হয় ‘গাণপত্য’ নামক বিশেষ হিন্দু কাল্টের। এঁদের কাছে শ্রীগণেশই হলেন প্রধান দেবতা। পরবর্তীকালে স্মার্তরা পাঁচ প্রধান উপাসক সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত করেন গাণপত্য সম্প্রদায়কে।  

হিন্দুমতে, শ্রীগণেশ হলেন বিঘ্নেশ্বর বা বিঘ্নহর্তা। তাই জীবনে নানা ধরনের বাধা দূর করার জন্য তাঁর পূজা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তিনি যে শুধু বাধা দূর করেন তা নয়, প্রয়োজনমতো তিনি বাধা তৈরিও করেন, কারণ তাঁর কাজ হল ধর্মরক্ষা করা। অর্থাৎ তিনি একদিকে যেমন বিঘ্নহর্তা, অন্যদিকে তিনিই আবার বিঘ্নকর্তা। তাই তাঁকে সন্তুষ্ট না রাখলে জীবনে বাধাবিঘ্ন বেড়েই চলবে বলে প্রচলিত ধারণা। এই কারণেই তাঁকে বলা হয় সিদ্ধিদাতা কারণ, তাঁর দয়া না হলে বাধা-বিপত্তি দূর হবে না এবং কার্যসিদ্ধিও হবে না। গণপতি উপাসনার মূলে নাকি রয়েছে 'ভয়'। দার্শনিক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় তাঁর 'লোকায়ত দর্শন'-এর দ্বিতীয় খণ্ডে এবং ইন্দ্রাণী সেন তাঁর 'গণপতির উৎস সন্ধানে' বইতে দেখিয়েছেন, 'গণ' বা নিম্নবর্গীয় সাধারণের দেবতা গণপতিকে আদিতে 'বিঘ্নকারী' হিসেবেই দেখা হত। তাই আগে তাঁকে তুষ্ট করে অন্য দেবতার পূজার প্রচলন ব্রাহ্মণ্যধর্ম শুরু করে। 

পঞ্চমুখী হেরম্ব গণেশ

শ্রীগণেশকে তুষ্ট করার উপায়? অবশ্যই ভক্তিভরে তাঁর পূজা এবং ব্রতপালন। শাস্ত্রমতে চতুর্থী তিথিটি শ্রীগণেশের জন্য নির্দিষ্ট এবং শুধুমাত্র ভাদ্রমাসের শুক্লচতুর্থী নয়, প্রত্যেক হিন্দু চান্দ্রমাসের দু’টি চতুর্থী তিথিতেই শ্রীগণেশের ব্রতপালন করা উচিত। প্রতি চান্দ্রমাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্থী তিথিকে বলা হয় সঙ্কোষ্ঠী চতুর্থী ও শুক্লপক্ষের চতুর্থী তিথিকে বলা হয় বিনায়ক চতুর্থী। ভাদ্রমাসের শুক্লচতুর্থীটি তাই আসলে একটি বিনায়ক চতুর্থী যা গণেশ চতুর্থী নামেই সারা দেশে প্রচলিত। 

বিনায়ক চতুর্থীকে বলা হয় বরদ বিনায়ক চতুর্থী অর্থাৎ বরদানের তিথি। প্রচলিত ধারণা, ভক্তরা এই তিথিতে উপবাসে থেকে সিদ্ধিদাতার পূজা করলে তিনি বিশেষ প্রসন্ন হন ও ভক্তকে জ্ঞান ও ধৈর্য বরদান করেন। এই তিথির উপবাস শুরু হয় সূর্যোদয় থেকে আর বিনায়কের পুজো করতে হয় দুপুরে, পাঁজিমুহূর্ত দেখে। সঙ্কোষ্ঠী চতুর্থীতেও উপবাসের ব্রতপালন করা হয়। এই তিথিকে আবার সঙ্কটহরা চতুর্থীও বলা হয়। এই নামের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে মাহাত্ম্য। অর্থাৎ জীবনের বাধা-বিপত্তি দূর করতেই মূলত এই উপবাস রাখা হয়। সারাদিন উপবাসে থেকে সন্ধ্যায় চাঁদ ওঠার পরেই এই উপবাস ভঙ্গের নিয়ম। যদি কোনও মঙ্গলবারে সঙ্কোষ্ঠী চতুর্থী পরে, তবে সেই তিথিকে অঙ্গার্কী চতুর্থীও বলা হয় এবং সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে গণ্য করা হয়। এছাড়া মাঘ ও পৌষ মাসের সঙ্কোষ্ঠী চতুর্থী তিথিগুলিও অত্যন্ত শুভ। 

মুম্বইয়ের সিদ্ধিবিনায়ক

এবছর ও ২০১৭ সালের আগামী সঙ্কোষ্ঠী ও বিনায়ক চতুর্থী তিথিগুলির তালিকা ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নীচে দেওয়া হল— 

সঙ্কোষ্ঠী চতুর্থী— ১৭ নভেম্বর (২০১৬), ১৬ ডিসেম্বর (২০১৬), ১৫ জানুয়ারি (২০১৭), ১৪ ফেব্রুয়ারি (২০১৭), ১৬ মার্চ (২০১৭), ১৪ এপ্রিল (২০১৭), ১৪ মে (২০১৭), ১৩ জুন (২০১৭), ১২ জুলাই (২০১৭), ১১ অগস্ট (২০১৭), ৯ সেপ্টেম্বর (২০১৭), ৮ অক্টোবর (২০১৭), ৭ নভেম্বর (২০১৭) ও ৬ ডিসেম্বর (২০১৭)। 

বিনায়ক চতুর্থী— ৩ ডিসেম্বর (২০১৬), ২ জানুয়ারি (২০১৭), ৩১ জানুয়ারি (২০১৭), ২ মার্চ (২০১৭), ৩১ মার্চ (২০১৭), ২৯ এপ্রিল (২০১৭), ২৮ মে (২০১৭), ২৭ জুন (২০১৭), ২৬ জুলাই (২০১৭), ২৫ অগস্ট (২০১৭), ২৩ সেপ্টেম্বর (২০১৭), ২৩ অক্টোবর (২০১৭), ২২ নভেম্বর (২০১৭), ২২ ডিসেম্বর।   

বাঁদিকে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা গণেশজননী, ডানদিকে রাজা রবি বর্মার আঁকা গণপতি

এই তিথিগুলি যেহেতু চান্দ্রমাসের তিথি তাই ব্রতপালন করতে হলে স্থানীয় পাঁজি দেখে বা পুরোহিতের পরামর্শ নিয়ে সঠিক মুহূর্ত জেনে নিতে হবে। এছাড়া ব্রতপালনের শেষে পূজার কিছু নিয়মাবলী রয়েছে। বাংলায় যেহেতু এই ব্রতের প্রচলন খুব একটা নেই, তাই বাঙালি পুরোহিতদের সবাই সব নিয়মকানুন ঠিকমতো জানেন না। সংক্ষেপে জানাই, সঙ্কোষ্ঠী চতুর্থীতে উপবাসের শেষে চাঁদ দর্শন করে (চাঁদ দেখার সুযোগ না হলে পাঁজি অনুযায়ী চন্দ্রোদয়ের নির্দিষ্ট সময়টি ধরতে হবে) শ্রীগণেশের ছবি বা মূর্তির সামনে একটি প্রদীপ জ্বালতে হবে। পুষ্প, নারকেল, কলা ও মোদক নৈবেদ্য দিতে হবে। সঙ্কটনাশন স্তোত্র, গণেশ অষ্টোৎহরা, ও বক্রতুণ্ড মহাকায় ইত্যাদি মন্ত্রোচ্চারণ করে, আরতি করতে হবে সিদ্ধিদাতার। 

মুম্বইয়ের বিখ্যাত লালবাগের রাজা

আরও পড়ুন

পুজো-পার্বণ-ব্রতকথা: মা লক্ষ্মীর কৃপালাভের কিছু মন্ত্র ও আচার-অনুষ্ঠান

বিনায়ক চতুর্থীর ক্ষেত্রে উপবাস ভঙ্গ ও পূজা করতে হয় মধ্যাহ্নকালে। তাই অনেকেই তার আগের দিন অর্থাৎ তৃতীয়া থেকেই উপবাস রাখেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে বিনায়ক চতুর্থীতে চন্দ্রদর্শন নিষিদ্ধ। মনে করা হয়, এই তিথিতে চন্দ্রদর্শন করলে মিথ্যা কলঙ্ক লাগে। তাই এই তিথির পরবর্তী দুই দিনও চন্দ্রদর্শন না করাই মঙ্গল। সঙ্কোষ্ঠী ও বিনায়ক চতুর্থী, দুই তিথির ব্রতপালনেই উপবাস চলাকালীন ফলমূল, সাবুর খিচুড়ি, আলুভাজা ও চিনেবাদাম খাওয়া যেতে পারে। সবশেষে বলি, নৈবেদ্যর বিষয়টি একেবারেই ব্যক্তিগত সামর্থ্যের উপর নির্ভর করে। সব সময়েই যে বিরাট আয়োজন করতে হবে তার কিন্তু কোনও মানে নেই। যে কোনও পূজার ক্ষেত্রে ভক্তিই কিন্তু শেষ কথা এবং সেরা নৈবেদ্য। 

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -