SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

বাঙালি সুইসাইড বম্বাররা কারা, কী তাদের মনস্তত্ত্ব

এপ্রিল ৭, ২০১৭
Share it on
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তত্ত্ববিদ স্কট আট্রানের সিদ্ধান্ত— আত্মঘাতী বাহিনীর লোকদের তেমন কোনও সুনির্দিষ্ট মনোজগৎ নেই। এবং তারা অনেক সময়েই যথেষ্ট শিক্ষিত ও স্বচ্ছল।

বাংলাদেশে আত্মঘাতী বিস্ফোরণের নয়া তরঙ্গ সে দেশে নতুন কোন ব্যাপার আদৌ নয়।

২০০৫ সালের ২৯ নভেম্বর চট্টগ্রামের প্রধান আদালতের বাইরের এক পুলিশ চৌকিতে দুই সুইসাইড বম্বার হানা দেয়। এই হানায় দুই পুলিশ অফিসার এবং অন্তত একজন বম্বার মারা যায়। এই হানার খানিকক্ষণের মধ্যে গাজিপুরে এক আদালতের ভিতরে একটি বিস্ফোরণ ঘটে। এতে তিন জন মারা যান, আইনজীবী ও আদালত কর্মী-সহ বহু মানুষ আহত হন। এই বিস্ফোরণের দায় বর্তায় এক আত্মঘাতী বম্বারের উপরেই। সম্ভবত সে-ও ওই বিস্ফোরণে মারা যায়।

দশ বছর পরে, ২০১৫-এর ডিসেম্বরে আহম্মদিয়া সম্প্রদায়ের একটি মসজিদে এক সুইসাইড বম্বার হানা দেয়। এই হানায় বহু মানুষ আহত হন। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে আত্মঘাতী হানার সংখ্যা ও হার— দুই-ই দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে তুলেছে। এর যথেষ্ট কারণও রয়েছে।

এখনও পর্যন্ত এই বোমারুরা নিজেদেরকেই মেরেছে, সম্ভাব্য লক্ষ্যের তেমন ক্ষতি করতে পারেনি। সাধারণ নাগরিক ও নিরাপত্তা কর্মীরা মোটামুটি অক্ষতই রয়েছেন। ২৪ ডিসেম্বর ঢাকায় এক মহিলা এবং এক কিশোর আত্মঘাতী হানা চালায়। কিন্তু তাদের গোপন ডেরা যে পুলিশ কর্মীরা ঘিরে ফেলেছিলেন, তাঁদের কোনও ক্ষতি সাধিত হয়নি। এমনকী বোমারুরা তাদের লক্ষ্যের ধারে-কাছে পৌছনোর কোনও চেষ্টাও করেনি।

মার্চের শেষ দিকে ঢাকায় বিমানবন্দরের কাছে, আসকোনার আরএবি ক্যাম্পে এবং খিলগাঁওয়ের আরএবি চেকপোস্টে কয়েকটি আত্মঘাতী হানা ঘটে। কিন্তু এগুলিতেও তেমন কোনও ক্ষয়ক্ষতি ঘটেনি। কেবল আশকোনায় দুই আরএবি কর্মী বোমারুদের ধাওয়া করার সময়ে আহত হন।   
 
মৌলবিবাজারের দুই ডেরায় (নাসিরপুর ও বারাহাট) যে জঙ্গিরা নিজেদের উড়িয়ে দিয়েছিল, তারাও ডেরা ঘিরে থাকা পুলিশ কর্মীদের আঘাত হানতে পারেনি। এই ঘটনায় যে ১০-১২ জন মারা যায়, তাদের মধ্যে জঙ্গিদের পরিবারও ছিল। শ্রীহট্টে সেনা ও প্যারা-কম্যান্ডোরা জঙ্গিদের প্রতিহত করে, তাদের গায়ে সুইসাইড ভেস্ট থাকা সত্ত্বেও তারা বিস্ফোরণ ঘটাতে পারেনি, স্নাইপাররা তাদের আটকে দেয়। শ্রীহট্টের ঘটনায় ৭ জন মারা যান, যাঁদের মধ্যে দুই পুলিশ কর্মী এবং আরএবি-র প্রধানও ছিলেন। এই হানা ছিল হিট অ্যান্ড রান অ্যাটাক। মোটর সাইকেল আরোহীরা পুলিশের কর্ডন লক্ষ্য কের গ্রেনেড ছোড়ে। এরা ‘আত্মঘাতী’  ছিল না।  

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, এই সুইসাইড বম্বাররা আত্মঘাতী হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তেমন কোনও ক্ষতি তারা করতে পারছে না। বাঙালি আত্মঘাতী বোমারুরা এখানেই বোধ হয় মধ্যপ্রাচ্য অথবা পাক-আফগান বোমারুদের চাইতে আলাদা। তারা যতটা না লক্ষ্যে আঘাত হেনেছে, তার চেয়ে বেশি ক্ষেত্রে তারা সপরিবারে আত্মহত্যা করেছে। এ থেকে মনে হয়, তারা একটা বিশেষ রাজনৈতিক বার্তা জানাতেই অধিক আগ্রহী এবং তাদের বিশ্বাসকে ব্যক্ত করতে আত্মাহুতি দিতে প্রস্তুত। লক্ষ্যে আঘাত করার চাইতে এই কাজেই তারা বেশি আগ্রহী।

এমনটা ঘটার কারণ কী? আফগানিস্তান, পাকিস্তান অথবা মধ্যপ্রাচ্যে এক একটা হানায় আত্মঘাতী বোমারুরা এক এক হানায় ২০ থেকে ২০০ মানুষকে হত্যা করে। এলটিটিই সুইসাইড বম্বাররা, বিশেষ করে মহিলা বোমারুরা এর আগে শ’য়ে শ’য়ে মানুষ মেরেছে, যার মধ্যে দুই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন—  শ্রীলঙ্কার প্রেমদাসা এবং ভারতের রাজীব গাঁধী।


 এমন ভাবেই কি বাংলাদেশি সুইসাইড বম্বারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়? হ্যাঁ, তা-ই হয়। এমনকী তারা যে সুইসাইড ভেস্ট ব্যবহার করে, তা-ও তেমন উন্নত মানের নয়। সেই কারণেই কি লক্ষ্যে পৌঁছনোর আগেই তা ফেটে যায়? নাকি, তারা ধরা পড়ার আগেই নিজেদের উড়িয়ে দিতে চায়? এই নির্দেশ কি তাদের নেতাদের কাছ থেকেই আসে? হ্যাঁ, কথাটা সত্যি বটে।

তারা কি নিরাপত্তা কর্মীদের ভয় দেখাতে চায়? তাদের নৈতিক জোরকে ভেঙে দিতে চায়? হ্যাঁ, একথাও ঠিক। তারা ধারাবাহিক হানার মাধ্যমে এই কাজটাই করতে চায়।

কাউন্টার টেররিজম বাহিনীর প্রধান মনিরুল ইসলাম ঠিকই বলেছিলেন, যখন মৌলবীবাজারে জঙ্গিদের পুলিশ জীবন্ত ধরতে চেয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, এদের জীবন্ত ধরলে জানা যাবে, কী ধরনের নির্দেশ এরা এদের নেতাদের কাছ থেকে পায়। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনও সুইসাইড বম্বারকেই জীবন্ত ধরা যায়নি। গুলশন কাফে-র হানাদারদের মতো এই সুইসাইড বম্বাররাও দেশের মাটিতেই খুব দ্রুত আর খুবই খারাপ ভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। কিন্তু এদের পরিচিতিগুলো একবার চোখ বুলোনোর দাবি রাখে।
 
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের রবার্ট পাপ-এর গবেষণা থেকে জানা যায়, আত্মঘাতী হানাগুলো একটা কৌশলগত যুক্তিকাঠামো অনুসারে অগ্রসর হয়। এর দ্বারা তারা আধুনিক গণতন্ত্রগুলির কাছ থেকে রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক দাবি আদায় করে।  পেপ জানিয়েছেন, ‘জঙ্গিরা জানে, এটা ফলদায়ী’। বেশ কয়েকটি গবেষণা আত্মঘাতী আক্রমণকারীর মানসিকতা, তার দারিদ্র্য এবং অশিক্ষার উপরে আলোকপাত করেছে। সেই সঙ্গে এ-ও জানিয়েছে যে, এর মূলে রয়েছে ধর্মীয় প্রচার, বিশেষ করে ইসলামী মৌলবাদ। কিন্তু এই ব্যাখ্যাগুলি ত্রুটিহীন নয়। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তত্ত্ববিদ স্কট আট্রানের সিদ্ধান্ত— আত্মঘাতী বাহিনীর লোকদের তেমন কোনও সুনির্দিষ্ট মনোজগৎ নেই। এবং তারা অনেক সময়েই যথেষ্ট শিক্ষিত ও স্বচ্ছল। মধ্যপ্রাচ্য ও পাক-আফগান সুইসাইড বম্বিংয়ের মনস্তত্ত্বকে বুঝতে বিশ্লষেকরা ঐতিহাসিক অবিচারের যৌথ সংবেদকে বুঝতে চেয়েছেন। বুঝতে চেয়েছেন, রাজনৈতিক অবদমন ও সামাজিক অপমানগুলিকেও। এর সঙ্গে আবার যুক্ত হয়েছে বিশ্বশক্তি, বিশেষ করে আমেরিকা ও তার সহগামী দেশগুলির হাতে অপমানের কল্পিত ও অকল্পিত ‘ইতিহাস’-ও।  

আত্মঘাতী হানার সঙ্গে ধর্মের কোনও যোগ নেই, জঙ্গি ইসলামি আন্দোলন ছাড়া। মনে রাখতে হবে, জাপানি সেনার কামিকাজি আক্রমণের কাহিনি এবং এলটিটিই-র সুইসাইড বম্বিংয়ের কথা। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে হানাদাররা ছিল তামিল হিন্দু।

তাজ হাশমি, যিনি যে কোনও পশ্চিমি বিশেষজ্ঞের চাইতে বাংলাদেশকে ভাল বোঝেন, তিনি এই আত্মঘাতী হানার ব্যাপারটাকে একটা মামুলি আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে আসতে বলেছেন বার বার। তাঁর মতে, এর শিকড় অনেক বেশি বিপজ্জনক রাজনীতির মধ্যে প্রোথিত।

সুইসাইড বম্বিং বন্ধ করতে অভিযান চালানো অবশ্যই প্রশংসনীয়, কিন্তু তার চাইতেও জরুরি বাঙালি আত্মঘাতী বোমারুদের কাহিনিতে ফিরে আসা। এই কাহিনিকে যদি না অনুধাবন করা হয়, তার শিকড়কে খুঁজে বের করে উপড়ানোর চেষ্টা করা না হয়, তবে তাদের নেতারা আরও দক্ষ আরও কুশলী বোমারু তৈরিতে সক্ষম হয়ে উঠবে।   

এটাও ভাবা দরকার যে, যে পুলিশ বা সেনা আত্মঘাতীদের ডেরাগুলিকে ঘিরে ফেলে তাদের আটকাতে সমর্থ হয়েছে, তারা জানত, এদের গায়ে সুইসাইড ভেস্ট বাঁধা রয়েছে। তা যেন তাদের আত্মঘাতের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার নামান্তর। মানবিকতার বিন্দু থেকে তাদের আত্মহত্যা বা হিংসা থেকে বিরত করার কোনও চেষ্টা এর মধ্যে নেই। আত্মঘাতী জঙ্গির আত্মঘাতের প্রস্তুতির মুহূর্তে তার মায়ের মুখটি মনে করিয়ে দেওয়ার কাজটায় তো কোনও ক্ষতি নেই!
 
সুতরাং, দেশের জঙ্গিদমন ব্যবস্থার আগে প্রয়োজন এই আত্মঘাতিদের পরিচিতিকে খুঁজে বের করা এবং তাদের প্রণোদনগুলির উৎস নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করা। আত্মঘাতী জঙ্গীদের গোপন ডেরা খুঁজে বের করার মতোই এটাও জরুরি কাজ।

 

Terrorism Suicide bombers Bangla Desh
Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -