SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

রোহিঙ্গা প্রশ্নে ভারত, চিন কেন মায়ানমারের পক্ষে দাঁড়াল

অক্টোবর ২৭, ২০১৭
Share it on
‘‘যদি জঙ্গিরা কালাদান নদীতে ভারতের নৌযান আক্রমণের চেষ্টা করে অথবা ইউনান-কায়ুক ফিউ তেল-গ্যাস পাইপলাইন উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকে, সেই সব পরিস্থিতি বরদাস্ত করা যায় না।’’

মায়ানমারের রাখাইন অঞ্চলে সু চি সরকারের প্রবল পরিমাণে সেনা মোতায়েনকে পশ্চিমি শক্তিগুলো যে চোখে দেখেছে, ভারত ও চিনের এ প্রসঙ্গে দৃষ্টিভঙ্গি তার চাইতে একেবারেই আলাদা ছিল। ভারত ও চিনের সেনারা হিমালয়ে পরস্পরের সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত এবং তারা মায়ানমারের উপরে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রেও প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু দেখার বিষয় এই— ভারত ও চিন রোহিঙ্গা সমস্যার ক্ষেত্রে আশ্চর্যজনক ভাবে একই সিদ্ধান্ত নিল। রাখাইনে সু চি সরকারের সেনা মোতায়েনের পরে দুই এশীয় শক্তিই মায়ানমারকে আলাদা গুরুত্ব দিতে বাধ্য হয়। পশ্চিমি বা ইসলামিক দেশগুলির বিন্দু থেকে এই মোতায়েন অবরুদ্ধ সু চি সরকারের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা জবাবদিহি চাইতে শুরু করে।  

রাখাইনে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের উপরে মায়ানমার সেনার অত্যাচার শেষ পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ রোহিঙ্গার দেশত্যাগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী বাড়তে থাকে। সেনা সংঘাতের আশঙ্কা ঘনীভূত হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কয়েকদিন আগেই দাবি করেছেন, মায়ানমার তাঁর দেশকে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে প্ররোচনা দিচ্ছে। হাসিনা মায়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে জেহাদি ঘোটালার আশঙ্কায় মায়ানমারের তাতমাদাউ বাহিনীকে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির বিরুদ্ধে সেনা-সাহায্য করার প্রস্তাব দিয়েছে। এখনও এই প্রস্তাবের কোনও উত্তর সু চি সরকার দেয়নি।  

সু চি ও নরেন্দ্র মোদী। ছবি: এএফপি

ভারতও এই জেহাদি ঘোটালার আশঙ্কা করে। ভারতের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির সঙ্গে বাংলাদেশের জামাত-উল-মুজাহিদিন, ভারতের মুজাহিদিন এবং পাকিস্তানের লস্কর-ই-তৈবার যোগাযোগ ও মদত সম্পর্কে জানিয়েছে। মনে রাখতে হবে, ২০০৮-এর মুম্বই-সন্ত্রাসী হানার ছক কষেছিল এই লস্কর-ই-তৈবাই। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির হাতে ৩০ জন পুলিশ ও সেনার মৃত্যুর ঘটনার পরের দিন জানায়— ‘‘সংকটের সময়ে আমরা মায়ানমারের পাশে দাঁড়াই। এই জঙ্গি হানার আমরা তীব্র নিন্দা করছি। নিহত পুলিশ ও সেনার আত্মার শান্তি কামনা করছি। সন্ত্রাস-বিরোধী লড়াইয়ে আমরা মায়ানমারের পাশে থাকব।’’ 

এই হানার পরেই মায়ানমার সেনা কাউন্টার অ্যাটাক করে। প্রবল হাঙ্গামা শুরু হয়। এবং প্রায় ৫ লক্ষ রোহিঙ্গা পলাতক অবস্থায় বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ভারতের ওই মন্তব্যে কোথাও কিন্তু মায়ানমার বাহিনীর এই প্রতিশোধাত্মক হানার উল্লেখ ছিল না। উল্টে ভারত তার সীমান্ত পেরিয়ে আসা ৪০ হাজার রোহিঙ্গাকে বেআইনি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করে বের করে দেওয়ার হুমকি দেয়। এদের মধ্যে ১৫ হাজার মানুষ জাতিপুঞ্জের হাই কমিশনার পল রিফিউজিস-এর নথিভুক্ত। ফলে জাতিপুঞ্জে ভারত কড়া সমালোচনার সম্মুখীন হয়।     

রাখাইনের ঘটনায় চিনও মায়ানমারকে জোরদার সমর্থন জানায়। মায়ানমারে চিনের রাষ্ট্রদূত জানান, ‘‘আমরা আশা করব, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হোক, যাতে মায়ানমার তার সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারে।’’ 

প্রসঙ্গত, রাখাইনে ভারত ও চিন— উভয়েরই স্বার্থ রয়েছে। ভারত রাখাইনে মাল্টি-মোডাল প্রোজেক্টে টাকা ঢেলেছে। এই প্রকল্পে সিত্তয়ে বন্দরের সঙ্গে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলের সংযোগের কারণে সমুদ্র-নদী-সড়ক যুক্তকরণ চলছে। অন্যদিকে, চিন কায়ুক ফিউ প্রকল্পে টাকা ঢেলেছে, যার দ্বারা চিনের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত তেল-গ্যাস লাইন ও রেলপথ বিস্তারের কাজ চলছে। উত্তর রাখাইনে এই প্রকল্পগুলো নির্বিঘ্নে এগোচ্ছে। কিন্তু রোহিঙ্গা মুসলমান অধ্যুষিত এলাকায় দিল্লি বা বেজিংয়ের যথেষ্ট মাথাব্যথার কারণ থেকে যাচ্ছে। 

নরেন্দ্র মোদী ও শি চিনফিং। ছবি: এএফপি

ভারতের সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের প্রাক্তন ডেপুটি চিফ মেজর গগনজিৎ সিংহ মন্তব্য করেছেন, ‘‘যদি জঙ্গিরা কালাদান নদীতে ভারতের নৌযান আক্রমণের চেষ্টা করে অথবা ইউনান-কায়ুক ফিউ তেল-গ্যাস পাইপলাইন উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকে, সেই সব পরিস্থিতি বরদাস্ত করা যায় না।’’ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী  ব্রিকস সামিটের অবকাশে চিনের প্রেসিডেন্ট শি চিনফিংয়ের সঙ্গে গত সেপ্টেম্বরের গোড়ায় একটা বৈঠক করেন ডোকলামে সীমান্ত সমস্যা নিয়ে। দুই পক্ষই ভুটান সীমান্তে সংঘাত এড়াতে সেনা সরাতে রাজি হয়। সূত্রের খবর অনুযায়ী, উভয় পক্ষই ‘আঞ্চলিক স্থায়িত্বের কারণে সৃজনশীল চিন্তাভাবনা’-র বিষয়ে রাজি হয়। এতে মায়ানমার সঙ্কটের ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। 

সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইন ইন্ডিয়া-র প্রধান বিনোদা মিশ্র জানিয়েছেন, ‘‘মায়ানমারে তার প্রভাব বজায় রাখতে চিন তিন দশক ধরে সমরাস্ত্র সরবরাহ করেছে। সেই সঙ্গে উন্নয়নমূলক কাজে অর্থ প্রদান এবং বৌদ্ধধর্মকে ধরে একটা সাংস্কৃতিক সংযোগও বজায় রেখেছে।’’ মিশ্রর মতে, ভারত ও চিনের তরফে মায়ানমার সেনা ও সরকারের প্রতি এই মনোভোবের পিছনে স্বার্থ রয়েছে। ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতি এবং চিনের তট ও সড়ক নীতি-র বাস্তবায়নে মায়ানমারের গুরুত্ব বিপুল। বলপূর্বক সম্পাদিত রণবিরতির ফাঁকতালে ভারত ও চিন মায়ানমারের উপরে প্রভাব বিস্তারের ব্যাপারে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। সেপ্টেম্বরে মোদীর মায়ানমারে সফরের প্রাক্কালে সে দেশে ভারতের রাষ্ট্রদূত বিক্রম মিস্রি জানান, মায়ানমারের উন্নয়নে ভারতের ভাবনা একেবারেই ‘অন্য’দের থেকে আলাদা। বলাই বাহুল্য, ‘অন্য’ শব্দটা ব্যবহৃত হয়েছে চিনের প্রতীক হিসেবেই। ভারত মায়ানমারে বেশ কিছু পাবলিক অ্যাসেট তৈরি করেছে, সেখানে তার বাণিজ্যিক ভিত্তি তৈরিরও ইচ্ছা রয়েছে— একথা মিস্রি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে জানান। তিনি বলেন, ‘‘আমরা কালাদানের মতো প্রকল্পে অর্থ বিনিয়োগ করি গ্রান্ট হিসেবে, কিছু কনসেশনাল ফিনান্সিংও করি। কিন্তু মায়ানমারের অর্থনীতির উপরে বোঝা চাপানো আমাদের উদ্দেশ্য নয়।’’  

রোহিঙ্গা শরণার্থী। ছবি: এএফপি

চিনের কাছে কায়ুক ফিউ গুরত্বপূর্ণ, কারণ এই বন্দর চিনা তেল ও গ্যাসের পাইপ লাইনের প্রবেশমুখ। মালাক্কা স্ট্রেটকে এড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল-গ্যাস আমদানির এটা একটা বিকল্প পথ। এই প্রকল্প শেষ পর্যন্ত রাখাইনে একটি স্পেশাল ইকোনমিক জেন তৈরির দিকে লক্ষ্য রাখে। চিন মায়ানমারের উপরে ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিতে চায় বলে ভারতের আশঙ্কা, একথা ভারতীয় অর্থনীতিবিদ প্রবীর দে বলেছেন। মায়ানমারে চিনের বিনিয়োগের চরিত্র জাপানিদের থেকে আলাদা। তারা থিলাওয়া এবং দাওয়েই অঞ্চলে সেজ তৈরি করছে। এখানে মায়ানমারের দান মাত্র ৫১ শতাংশ। কায়ুক ফিউয়ের সঙ্গে এই প্রকল্পের মাত্র ২ শতাংশ ফারাক থাকলেও, তার প্রতীকী ব্যঞ্জনার ফারাক অনেকখানি— বলেছেন সিমোন তায়, সিঙ্গাপুর ইনস্টিটউট অফ ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের চেয়ারম্যান।   

মায়ানমারের রাজনীতিকরা চিনকে খোলাখুলি সমালোচনা করতে চান না। কারণ উত্তরের এই প্রতিবেশীর কারণে তারা জাতিপুঞ্জে বিশেষ সুবিধা পায়। রাখাইনে তাদের সেনা-তাণ্ডবকে চিনই মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের সামনে সুরক্ষা দেয়। 

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -