SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

রোদে-জলে: রক্তচোষারা চোখ দিয়েই শুষে নিত রক্ত...

জানুয়ারি ৩, ২০১৭
Share it on
একদিন রমেশচন্দ্র গার্লস স্কুলের একটা মেয়ে স্কুল থেকে ফেরার পথে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল, তাকে ঘিরে ভিড়ে উঁকি দিয়ে মনে ছড়িয়ে পড়ল কী ভয় কী ভয় !

লিখতে লিখতে কৈশোর পেরিয়ে সদ্য তরুণ বয়সে পৌঁছেও ভুলে গিয়েছিলাম দু’তিনটি আশ্চর্য ঘটনার কথা। সে বড়ো আশ্চর্য! সে বড়ো আশ্চর্য! বলি তা হলে।

যত দূর মনে পড়ে, তখন স্কুলে হয়েছি কি হইনি, সেই শিশু বয়সের একটা বেশ হতবাক হয়ে যাওয়া একটা ঘটনা: শ্রীরামপুরের বেনেপাড়ায় যে বাড়িতে আমরা থাকতাম, তার কাছেই ছিল একটা মস্ত মাঠ। লোকমুখে এই মাঠ— গ্যান্ডার মাঠ। আসলে জমিদার গোস্বামী পরিবারের জ্ঞান গোস্বামী, তাঁর নামে জ্ঞানদার মাঠ, হয়ে গিয়েছিল গ্যান্ডার মাঠ। বিরাট সে মাঠে রাখালেরা গরু চরাত, ছাগল চরত। আমরা খেলতাম। আমাদের ভাড়াবাড়িতে একতলার ভাড়াটে থাকু-ননাদের ছিল তিন-চারটে ছাগল। একদিন খুব হই হই। গ্যান্ডার মাঠে গিয়ে আমরা ছেলেপিলের দল দেখলাম অনেকগুলো গরু মরে পড়ে আছে। থাকু-ননাদের তিনটে ছাগলও মরে পড়ে আছে। খুব কষ্ট হল। অবাকও হলাম। থাকু-ননার মা, বড়মা,বললেন, আরও অনেকে বলাবলি করছিল, একদল লোক নাকি মাঠে মাঠে ঘুরছে, ঘাসে বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছে, গরু মরলে চামড়া নিয়ে নেবে। কেউ কেউ বলল, গোমড়ক। ব্যাপারটা নিয়ে কদিন হই হই চলল।

যখন ক্লাস টুয়ে পড়ি, আমরা আমাদের নিজেদের নতুন বাড়িতে চলে এলাম। শহরের পশ্চিম দিকটায়, ডাক্তারবাগানে। এই অঞ্চল তখন ফাঁকা ফাঁকা ছিল। অনেক মাঠ ছিল। তখন খুব জোরে জোরে হাওয়া বইত। ঝড়ও হতো। ওই রকম একটা হাওয়ার দুপুরে আকাশ দিয়ে উড়ে যেতে দেখলাম একটা শাড়িকে। বাতাসে ঘুরপাক খেতে খেতে সেটা উঠে যাচ্ছে ওপরে... আরও আরও ওপরে ...। গাঢ় গঙ্গাজল সে শাড়ির রং, রোদে তার জরি ঝলকাচ্ছে। আমার মা বলল, মাঠে ধোপারা কাপড় শুকোতে দিয়েছিল, ঝড়ে উড়ে যাচ্ছে।

আর একটা ঘটনা ভয়ের। সেটা ঘটেছিল যখন ষষ্ট বা সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি। আমাদের শ্রীরামপুর শহরে পাড়ায় পাড়ায় রটে গেল, রক্তচক্ষু কিছু লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা ভয়ঙ্কর। আমাদের মত কমবয়সি ছেলে-মেয়েদের দিকে তারা একদৃষ্টে নাকি তাকাচ্ছে, যার দিকে তাকাচ্ছে তার সব রক্ত শুষে নিচ্ছে। তারা রক্তচোষা। মহা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল শহরে, আমদের মতো ছেলেপিলেদের মনে। কড়া রোদ্দুরের গ্রীষ্মকাল তখন। একদিন রমেশচন্দ্র গার্লস স্কুলের একটা মেয়ে স্কুল থেকে ফেরার পথে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল, তাকে ঘিরে ভিড়ে উঁকি দিয়ে মনে ছড়িয়ে পড়ল কী ভয় কী ভয় ! সে সময় বেশ কিছুদিন ভয়ে ভয়ে কেটেছে। নির্জন রাস্তায় কোনও অচেনা লোক যদি ঈষৎ তাকাতেন ভয়ে কুঁকড়ে যেতাম, কখনও কখনও ছুট লাগাতাম। আবার একটা প্রতিরক্ষামুলক টোটকাও ছিল, জামার বোতাম খুলে বুকে একটু থুতু ছিটিয়ে নেওয়া, তাতে রক্তচোষারা নাকি রক্ত টানতে পারে না। রক্তচোষার ভয় ধীরে ধীরে এক সময় মিলিয়েও গেল। এই কয়েক বছর আগে কলকাতায় যখন স্টোনম্যানের আতঙ্ক যখন ছড়িয়েছিল, মনে পড়েছিল বাল্যের সেই রক্তচোষার আজগুবি ভয়। স্টোনম্যানের ঘটনা অবশ্য সত্যিসত্যিই ঘটেছিল, রাস্তার পাথরের চাঙড় দিয়ে কলকাতায় কয়েকটি জায়গায় কয়েকজন ফুটপাথবাসীকে হত্যা করা হয়েছিল, বিকৃত মস্তিস্কের খুনিকে পুলিশ গ্রেপ্তারও করেছিল। নাকি করেনি!

এবার চলে আসি ১৯৭১ সালে, কলেজে ভর্তি হওয়ার সময়টিতে। ওই বছরটি তো সবার জানা। দিন বদলের স্বপ্নে সময় তখন টগবগ করছিল। ভারতেতিহাসের গ্রন্থি-সময় যেন পাক খেয়েছিল এ উপমহাদেশের এই পুর-প্রান্তেই। এ বাংলা উত্তাল নকশালপন্থী আন্দোলনে, ওই বাংলায় তখন মুক্তিযুদ্ধ। ওই বছর আমাদের হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা তিনবার পিছিয়ে গিয়েছিল। পরীক্ষা হয়ে রেজাল্ট বেরতে বেরতে বছর প্রায় শেষ হয়ে এল। হয়েছিল কী, আমাদের শহরে প্রতি বছর শীত শুরু হতেই সাহিত্য সংস্কৃতির কিছু কিছু আয়োজন হত, কবি সম্মেলন হত। শ্রীরামপুরে আমার অগ্রজ কবিতাপ্রয়াসী কয়েকজন বের করেছিলেন ‘শীর্ষবিন্দু’ নামে একটি কবিতা পত্রিকা। তারা আয়োজন করেছিলেন সেবার কবি সম্মেলনের। সেই কবি সম্মেলনে তুষার রায়, শান্তিকুমার ঘোষ, শান্তনু দাস এসেছিলেন। আমি কবিতা পড়ার পর কবি ধূর্জটি চন্দ আমার ডায়েরি থেকে ৭টি কবিতা ছিঁড়ে নিয়ে নিয়েছিলেন, তাঁর ‘এবং’ পত্রিকার জন্য।

এর পর তো হায়ার সেকেন্ডারির রেজাল্ট বের হল। নকশালপন্থার ভয়ে বাবা আমাকে বন্ধুদের থেকে বিযুক্ত করতে চাইলেন, কলকাতার কোনও কলেজে আমাকে ভর্তি হতে দেওয়া হল না। শ্রীরামপুর কলেজেও নয়। আমাকে ভর্তি করা হল উত্তরপাড়ার প্যারীমোহন কলেজে। কিন্তু তখন প্যারীমোহন কলেজ ছিল ছাত্র রাজনীতির তীর্থ। তবে সে অন্য প্রসঙ্গ। যে কথা বলতে চাইছি, বলি। কলেজে প্রথম দিন ক্লাস করতে যাচ্ছি, খুব মন খারাপ, একজনও বন্ধু নেই। একা একা চলেছি। শ্রীরামপুর থেকে উত্তরপাড়া প্যারীমোহন কলেজ যাওয়ার সহজপথ হল ট্রেনে বালি গিয়ে হাঁটা পথে জি টি রোডে পৌঁছে বালি খালটির ছোট্ট সড়ক-সেতুটি পেরোলেই ওই কলেজ। আমিও ওইভাবে জি টি রোডে সড়ক সেতুটির শেষ মাথায় প্রায় প্যারীমোহন কলেজের দরজার কাছে পৌঁছেছি, সেতুর নিচে, খালপারে বটগাছটির তলায় ছাত্রছাত্রীদের একটা জটলা থেকে কানে এল একজন উচ্চ স্বরে কবিতা পড়ছেন.. ইটাক খিটাক বাজে নার্ভে হ্যান্ডলুম...। আরে এ তো আমারই লেখা কবিতার লাইন! আমাদের বাড়ির কাছেই সাহাদের তাঁত কারখানা আছে তো, সেখান থেকেই লাইনটা মাথায় এসেছিল। আমি গুটি গুটি ওই ছাত্রছাত্রীদের জমায়েতে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। এরা সব আমার সিনিয়র ছাত্রছাত্রী। দেখি, রোগা,লম্বা, প্যান্টের উপরে হলদে পাঞ্জাবি পরা এক তরুণ, হাতে ধূর্জটি চন্দের 'এবং' পত্রিকা, আমার কবিতা পড়ছেন। এক সময় তাঁর কবিতা পড়া শেষ হল। তখন ওঁদের নজর পড়ল আমার ওপর। নতুন ছেলে? তুমি কবিতা পড়ো?  শুধোলেন হলদে পাঞ্জাবি পরা ওই তরুণটিই। হুঁ— কাঁচুমাচুভাবে বললাম আমি। লেখো নাকি— ফের প্রশ্ন। এবার চুপটি রইলাম। সংকোচ হল। এবার সেই সিনিয়র দাদা বললেন, কবিতা লেখো, কবিতা লেখো...। দেখো তো তোমার মত একটা বাচ্চা লিখেছে, এই তো লিখেছে, সবে হায়ার সেকেন্ডারি দিয়েছে...। কী নাম তোমার ? থাক কোথায় ? এবার সলাজে পরিচয় দিতে হল।

ব্যস, উত্তরপাড়া প্যারীমোহন কলেজে আমার নিঃসঙ্গতা কেটে গেল। ওই সিনিয়র দাদার নাম উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায়। সত্তর দশকের প্রারম্ভিক পর্বের কবি, সে সময়ে অনেক লিখতেন, লিটল ম্যাগাজিনগুলিতে সে সময় তাঁর অনেক কবিতা পড়েছি। আমি যখন ভর্তি হই, তিনি ছিলেন তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়ায় আমি আলোড়িত হলাম।
 
ওই আমার প্রথম পুরস্কার। এ জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার।

 

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -