SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

রোদে জলে: স্বপ্নভ্রমণ আর চোখ জুড়নো নেপাল-হিমালয়

এপ্রিল ২৭, ২০১৭
Share it on
পাহাড়ে পাহাড়ে পাক দিয়ে দিয়ে অপরূপ সে পথ, ভয়ালও। সন্ধ্যায় বাস পৌঁছে দিল আলো ঝলমল উপত্যকা কাঠমান্ডুতে। সারা নেপাল তখন উৎসবে মুখর।

উত্তরপাড়া প্যারীমোহন কলেজে আমাদের জীববিজ্ঞানের ক্লাসে এক ছাত্র আমাদের একটু পরে ভর্তি হয়েছিল, সে নেপালি, নাম জয় বাহাদুর, থাকত উত্তরপাড়াতেই একটা মেসে। তার কেতাদুরস্ত ঝকঝকে সাজ ছিল তাকিয়ে দেখার মতো। নেপালে তখন হিপিদের ডেরা। তাদের গল্প খুব শুনেছি জয়ের কাছে। জয়ের বাবা ছিলেন নেপালে কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, কমিউনিস্ট পার্টি তখন নেপালে নিষিদ্ধ। রাজা মহেন্দ্রর নেপাল সরকার তাঁকে সে দেশ থেকে বহিষ্কার করেছিল। প্রধানমন্ত্রী নেহরু জয়ের বাবাকে ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছিলেন, রানিগঞ্জে সিপিআই দলের ট্রেড ইউনিয়ন নেতা ছিলেন তখন জয়ের বাবা। তাঁর নাম আর মনে নেই আমার।

কলেজে ভর্তি হওয়ার কয়েক মাস পরেই উদ্ভিদবিদ্যার শিক্ষামূলক সফরে স্যারেরা আমাদের নিয়ে গিয়েছিলেন দার্জিলিং! ওই প্রথম আমার দার্জিলিং যাওয়া। হিমালয়ের দরজায় পর্বতমালার ওই বিশালত্ব আমাকে বিহ্বল করে দিয়েছিল। অপরূপা ওই শৈলশহর, টয়ট্রেন, ঝকঝকে অক্টোবরে আমাদের স্নোভিউ হোটেলের সামনে যেন ছুঁই ছুঁই দূরত্বে কাঞ্চনজঙ্ঘা— আমরা সকলেই বিস্মিত, মুগ্ধ হয়েছিলাম। এর পর তিন বছরের স্নাতক ক্লাসের শিক্ষাক্রমে জীববিদ্যার শিক্ষামূলক সফরে দিঘা ও চাঁদিপুরের বঙ্গোপসাগরতীরে গিয়েছি। সমুদ্রও বিরাট। বিস্ময়কর। তবে পাহাড়ের প্রতিই আমার অধিক আকর্ষণ। আমার মেয়ে জীববিজ্ঞানেই স্নাতকোত্তর। সে এই ভারতে বহু অরণ্য-পর্বত-সমুদ্রতীরে গিয়েছে। তবে কিনা সে সমুদ্রবিলাসিনী, পাহাড় অপেক্ষা সে সাগর পছন্দ করে। কবি রমেন্দ্রকুমার আচার্যচৌধুরী লিখেছিলেন, রুচি নিয়ে বিতর্ক চলে না।


টয় ট্রেন, দার্জিলিং

উদ্ভিদবিদ্যার সফরে অরণ্য পর্বত থেকে আমরা সংগ্রহ করতাম ফার্ন, অর্কিড, মস, গাছ পাতা। জীববিদ্যায় সংগ্রহ করতে হত কীটপতঙ্গ, প্রজাপতি, তারামাছ, স্কুইড, সিপিয়া...। এছাড়া আমরা কাটাকুটি করেছি আরশোলা, ব্যাঙ, গিরগিটি, গিনিপিগ, হাঙর, পায়রা...। এসব প্রাণীদের হত্যাই করতাম রাসায়নিক প্রয়োগে। এখন বনজ সম্পদ আহরণ, এসব প্রাণীনিধন কড়া আইনে একেবারে নিষিদ্ধ। আমার মেয়ে এখন গবেষণারতা, গোটা শিক্ষাজীবনে তাকে ও তার সহপাঠীদের এই প্রাণীহত্যা করতে হয়নি। তারা নেট ঘেঁটে দেখে নিয়েছে পায়রার স্নায়ুতন্ত্র, তিমির মস্তিষ্ক। কয়েক বছর আগে খবরে দেখেছিলাম, উত্তরবঙ্গে দুই বিদেশিকে জলপাইগুড়ি পুলিশ প্রজাপতি ধরার অপরাধে আটক করায় দিল্লির বিদেশ মন্ত্রকে হইহই পড়ে গেছে। তাঁদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য ইউরোপ আমেরিকার বিজ্ঞানীরা ভারত সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছেন। জানা গিয়েছে, উত্তরবঙ্গে ধৃত বিদেশি দু’জনের একজন নোবেল বিজয়ী প্রাণীবিজ্ঞানী!


কাঞ্চনজঙ্ঘা

কলেজে এসব শিক্ষামূলক সফর ছাড়াও আমরা নিজেরা দল বেঁধেও ঘুরতে গিয়েছি। তবে আমাদের নিজেদের বৃহত্তম সফরটি ছিল নেপাল ভ্রমণ।  ১৯৭১এ হায়ার সেকেন্ডারি তিনবার পিছিয়ে যাওয়ায় আমাদের স্নাতক শ্রেণির ফাইনাল পরীক্ষার রেজাল্ট বের হতে হতে ১৯৭৫ সাল এসে যায়। রেজাল্ট তখনও বার হয়নি, ১৯৭৫ এর জানুয়ারি মাস। সকাল বিকেল আমরা আড্ডা দিতাম উত্তরপাড়া কলেজের সামনে অমরের মিষ্টির দোকানের বেঞ্চ ও তৎসংলগ্ন বালিখালের সড়ক সেতুর রডের উপরে বসে। কয়েকদিন আমি অনুপস্থিত ছিলাম, সেদিন সকালে আমি গিয়ে দেখি আমার অনুপস্থিতির ভিতরেই জয়বাহাদুরের সঙ্গে উদয়, শুভ্র, নরেন ঠিক করে ফেলেছে নেপাল সফর। ওরা সেদিনই রাতে রওনা হচ্ছে। শুনে আমার রাগ হল। আমি চেঁচামেচি শুরু করলাম। আমার হইহইয়ে উদয় বলল, ঠিক আছে তুই এক্ষুনি ১২৫ টাকা দে। বাবাকে বলে এখনই তোর টিকিটটা করে নিতে হবে। উদয়ের বাবা রেলে চাকরি করতেন। ১২৫ টাকা তখন অনেক টাকা। অত টাকা তখন আমি কোথায় পাব! আমার বাবা অফিসে চলে গেছেন! আমাদের মধ্যে বিপিন তখন অনেকগুলো টিউশনি করত, হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাও করত। বিপিন বলল, আমি তোকে ১২৫ টাকা ধার দেব। তৎক্ষণাৎ সে ব্যঙ্কে গেল ও টাকা নিয়ে এল। রাতে হাওড়া থেকে আমরা নর্থ বিহার এক্সপ্রেসে রওনা হলাম।
 
কাকভোরে রানিগঞ্জ স্টেশনে এসে জয়ের বাবা, ট্রেড ইউনিয়ন নেতা আমাদের সঙ্গে দেখা করলেন। সন্ধ্যায় আমাদের ট্রেন পৌঁছল সমস্তিপুর স্টেশনে। সমস্তিপুর স্টেশন সেই সন্ধ্যায় ছিল একেবারে ঝকঝকে তকতকে। সারা স্টেশনে নতুন রং, চারিদিক পরিচ্ছন্ন। তার কারণও ছিল। দিল্লি থেকে রেলমন্ত্রী এসেছিলেন কয়েকদিন আগে। সমস্তিপুর-মুজফফরপুর ব্রডগেজ লাইন উদ্বোধন করতে। এই স্টেশনেই সেই উদ্বোধনী সভার মঞ্চের নিচে পেতে রাখা বোমায় নিহত হয়েছিলেন রেলমন্ত্রী ললিতনারায়ণ মিশ্র, ২ জানুয়ারি ১৯৭৫ সালে। আমরা নেপাল যাওয়ার পথে সমস্তিপুর স্টেশনে পৌঁছেছিলাম তারই কয়েকদিন পর, দেখেছিলাম ঝকঝকে প্লাটফর্মে একটা জায়গায় দগ্ধ বিস্ফোরণের চিহ্ন, দড়ি দিয়ে জায়গাটা ঘিরে পাহারা দিচ্ছেন সশস্ত্র আধা সামরিক জওয়ান কয়েকজন। প্রাক জরুরি অবস্থার ওই সময় রেলমন্ত্রী মিশ্রর হত্যাকাণ্ডে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী অভিযোগ করেছিলেন, বিদেশি চক্রের হাত, সি আই এর দিকে তুলেছিলেন আঙুল। ৩৯ বছর ধরে চলা বিচারে ২০১৪ সালে দিল্লির আদালত ৪ আনন্দমার্গীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিল, পরে হাইকোর্ট সিবিআইয়ের দেওয়া প্রমাণে সন্তুষ্ট না হয়ে তাদের রেহাই দিয়েছে।


নেপাল

সারা রাত সমস্তিপুর স্টেশনে কাটিয়ে পরদিন দুপুরে আমরা ধীর গতির ছোট ট্রেনে সমস্তিপুর থেকে রক্সৌল পৌঁছই সন্ধে পার করে। প্রাক জরুরি অবস্থার তপ্ত সময় তখন। দুপুরে ধীর গতির ট্রেনে আসতে আসতে উত্তর বিহারের ছোট ছোট স্টেশনেও দেখেছি জয়প্রকাশ নারায়ণের সমর্থকদের মিছিল— তানাশাহি নহি চলে গা। রক্সৌলে ছোট্ট পান্থশালায় সে রাত কাটিয়ে পরদিন ভোরে রিকশয় সীমান্ত পেরিয়ে নেপালের বীরগঞ্জ। ওই ভোরবেলাতেই কাঠমান্ডুর বাস। পাহাড়ে পাহাড়ে পাক দিয়ে দিয়ে অপরূপ সে পথ, ভয়ালও। সন্ধ্যায় বাস পৌঁছে দিল আলো ঝলমল উপত্যকা কাঠমান্ডুতে। সারা নেপাল তখন উৎসবে মুখর। ক'দিন পরেই রাজা বীরেন্দ্রর রাজ্যাভিষেক। কাঠমান্ডু, তার আশপাশ দিন সাতেক আমাদের খুব ঘুরিয়ে দেখিয়েছিল জয়। নারায়ণহিতি প্রাসাদ, রানি পোখরি, পশুপতি মন্দির। বাবা বহিষ্কৃত কমিউনিস্ট নেতা, কিন্তু বাবার সুবাদেই জয়ের খুব খাতির তার স্বদেশে। সদ্য গড়া ছোট্ট একটা হোটেলে ছিলাম আমরা, একদিন এলেন দুই ভদ্রলোক। জয়ের বাবা কেমন আছেন, খোঁজ খবর নিলেন। এরা সরকারি লোক, আমাদের ঘোরাঘুরির জন্য চালকসহ জিপগাড়ি দিতে চেয়েছিলেন, জয় নিল না। শুভ্র খুব ভাল ছবি তুলত, তদুপরি এক্সপেরিমেন্টও করত। এক সন্ধেয় রানি পোখরির আলোকমালার ছবি তুলছে, ভ্রমণরত এক ভদ্রলোক বললেন, ফ্ল্যাশ ছাড়া ছবি উঠবে! শুভ্র তাঁর ছবি তুলে বলল, আপনাকে পাঠিয়ে দেব। ভদ্রলোক নাম বললেন, ঠিকানা জানালেন, স্রেফ কাঠমান্ডু। শুভ্র বলল, উঁহু পুরো ঠিকানা। মানুষটি হেসে বললেন, আমার চিঠি তো, হারাবে না। এবার শুভ্র তাকাতেই বয়স্ক লোকটি অপরাধীর ভঙ্গিতে বললেন, সরকারি কাজ করি তো, বেশ লিখে নাও মিনিস্টার, পোস্ট অ্যান্ড টেলিগ্রাফ, রয়্যাল গভর্নমেন্ট অফ নেপাল।


কাঠমান্ডু

টিলার উপরে গুচ্ছবিপণী। আকর্ষণীয় হরেক সামগ্রী। কাঠমান্ডুর দুপুর। আমরা ঘোরাঘুরি করছি। সিঁড়ির নিচে থামল তিন চারটি গাড়ি। নেপালের পতাকা লাগানো গাড়িটি থেকে নামলেন রাজা বীরেন্দ্র, রানি ঐশ্বর্য। দু তিনজন রক্ষী নিয়ে তরুণ রাজা, রাণী সিঁড়ি ভেঙে উঠে আসতে লাগলেন ওপরে বিপণীগুলির দিকে। ওপরে, সিঁড়ির পাশে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম আমরা। আমাদের কাছে এসে একটু দাঁড়ালেন রাজা বীরেন্দ্র, ইন্ডিয়ান? আমরা জানালাম, হ্যাঁ, পশ্চিম বাংলা থেকে এসেছি। করোনেশনের অভিনন্দন জানালাম রাজাকে। ওয়েলকাম, হাত বাড়ালেন রাজা বীরেন্দ্র। রানি ঐশ্বর্য হাসলেন। তার পর তাঁরা চলে গেলেন বিপণীগুলির অভ্যন্তরে।

এই রাজা, এই রাণী নারায়ণহিতি প্রাসাদে ২০০১এর ১ জুন নৈশভোজের পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ খুন হন। ব্যথিত হয়েছিল মন। বড় কষ্ট বোধ করেছিলাম। আমাদের বন্ধু জয়বাহাদুরের সঙ্গেও কলেজ ছাড়ার পর আর দেখা হয়নি। কোথায় আছে সে? সে কি কাঠমান্ডুতে ফিরে গেছে? ২০১৫র ভূমিকম্পে ধূলিসাৎ কাঠমান্ডুর ছবি দেখেও উদ্বিগ্ন হয়েছি। এখনও ভাবি, নিশ্চয় ভালো আছে জয়, কিচ্ছুটি হয়নি ওর!

ছবি সৌজন্য: পিক্সঅ্যাবে

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -