SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

পশ্চিমবঙ্গে বসে আরব বেদুইনের মদ্যপান অথবা আফগান গুহায় বাংলা মদের আসর

অগস্ট ১১, ২০১৭
Share it on
কোন মদ কখন পান করতে হয়, সুরাপানের পরিবেশ তৈরি করে নিতে হয়— এসব নিয়মনীতি মানতেন সুনীলদা, তিনি মদ ও মদ্যপান বিষয়ে বিলিতি বইপত্রও জোগাড় করতেন, সেসব খুঁটিয়ে পড়ে মদ্যপানের পরিবেশ রচনা করতেন তিনি।

‘‘সুরা একটি বিশ্ববিদ্যালয়’’— যিনি বলেছিলেন, তিনি সুনীল মিত্র। শুধু এইটুকুই নয়, একটু থেমে, তারপরই ফের বলেছিলেন, ‘‘বুঝলে কিনা, শক্তি ওই ইউনিভার্সিটির সিঁড়িতে বসে আছে, আর আমি সামনের মাঠে ঘোরাঘুরি করছি।’’ শুনে আমি তাজ্জব! শক্তি চট্টোপাধ্যায়, কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় কিনা সুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ঢোকার চান্স পাননি! সুনীলদা বলেছেন, ‘‘হুঁ, ঢুকেছে কে?- ঋত্বিক, ঋত্বিক ঘটক।’’

এই সুনীলদা, সুনীল মিত্র আমাদের শ্রীরামপুর শহরে ই এস আই হাসপাতালে কর্মসূত্রে এসেছিলেন ঠিক জরুরি অবস্থার বছর দেড় দুই আগে, ১৯৭৩-৭৪ সালে। তাঁর আগমনে কী হয়েছিল? রঙিন হয়ে গিয়েছিল আমাদের শহর, রঙিন হয়ে গিয়েছিল। মাতিয়ে দিয়েছিলেন তিনি তাঁর চমকপ্রদ চলাফেরায়, বাকপটুত্বে, বোহেমিয়ান জীবনচর্যায়। ধবধবে ধুতি-পাঞ্জাবিতে তাঁর রামধনুর সাত রং ঝিলিক দিত। শ্রীরামপুরে ই এস আই হাসপাতালের আবাসনে তিনি থাকেন। তাঁর স্ত্রী, পুস্পবৌদিও তাঁর নার্সের চাকরিতে বদলি হয়ে শ্রীরামপুর ই এস আই হাসপাতালে এসেছিলেন। তাঁদের তিনটি মেয়ে তখন খুবই ছোট ছোট। হাওড়ার শিবপুরে ছিল সুনীলদার বাড়ি। শিবপুর থেকে এক সময় 'বিভিন্ন কোরাস' নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন বের করতেন, শ্রীরামপুরে এসে সে পত্রিকা ফের প্রকাশ করতে লাগলেন। সুনীলদার লেখা কেবল একটি কবিতার কথা জানতাম, সেটি বের হয়েছিল ষাটের দশকে 'কৃত্তিবাস' পত্রিকায়, আর কবিতা লেখেননি তিনি, তবে রঙিন মানুষটি তাঁর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বে শ্রীরামপুরের তৎকালের কবিতাপ্রয়াসীদের চুড়োয় বসেছিলেন।


শক্তি চট্টোপাধ্যায়। ছবি: ইউটিউব

কবিতা না লিখলেও, চমকপ্রদ ব্যক্তিগত গদ্য লিখতেন তিনি, সে গদ্যগুলি নিয়ে মধ্য আশির দশকে তাঁর অকালমৃত্যুর আগে বের হয়েছিল বই— 'খ্রিস্টের রক্ত করবী ফুলের মতো লাল'। তিনি ছিলেন সুরারসিক, তা থেকে সুরাসক্ত হয়ে গেলেও, কখনও বেতাল, বেসামাল হতে দেখিনি আমি। কোন মদ কখন পান করতে হয়, সুরাপানের পরিবেশ তৈরি করে নিতে হয়— এসব নিয়মনীতি মানতেন সুনীলদা, তিনি মদ ও মদ্যপান বিষয়ে বিলিতি বইপত্রও জোগাড় করতেন, সেসব খুঁটিয়ে পড়ে মদ্যপানের পরিবেশ রচনা করতেন তিনি। তাতে ঘটে যেত অনেক নাটকীয় কাণ্ড।

এক সন্ধ্যায় ই এস আই হাসপাতালের কর্মচারীদের আবাসনে সুনীলদার ফ্ল্যাটে গিয়েছি, দরজা খুলে পুষ্পবৌদি বললেন, তোমার দাদা ওই ঘরে অনেকক্ষণ দরজা বন্ধ করে বসে রয়েছেন। আমি সে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে দেখি বন্ধ দরজার তলা থেকে আসছে একটু একটু  জলের ধারা, সে জল পায়ে ঠেকতেই দেখি তা হিমশীতল! দরজায় টোকা দিতে সুনীলদা দরজা খুলে আমাকে ঢুকিয়ে ফের দরজা বন্ধ করতে করতে বললেন, ‘‘ঠিক সময়ে এসেছ, বসো, বসো।’’ আমি তো তাঁকে দেখে হতবাক, আরও অবাক ওই ঘরে সুনীলদা রচিত 'পরিবেশ' দেখে।


ঋত্বিককুমার ঘটক। ছবি: ইউটিউব

পরনে লুঙ্গি, খালি গায়ে সুনীলদা একটা বিছানার চাদর মাথায় জড়িয়ে পাগড়ি বেঁধেছেন, ঘরের সব আলো নিবিয়ে দড়ি বেঁধে ঝুলিয়েছেন একটি হ্যারিকেন, মেঝেয় একটি চটের বস্তা পেতে তার উপরে আমাদের স্টেশন-বাজারের মাছের আড়ত থেকে আনা মস্ত একটা বরফের চাঙর, পাশে রাখা ঠোঙায় আঙুর, আশপাশে কিছু আখরোটও! বরফে আঙুর ঘসে ঘসে মুখে তুলে সুনীলদা বাংলা মদের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে বললেন, ‘‘কাবুলে, কান্দাহারে, তোরা বোরার গুহায় কাবুলিওয়ালারা এভাবেই মদ খায়। বিছানার চাদরখানি পাকিয়ে আমার হাতে তুলে দিয়ে সুনীলদা বললেন, পাগড়ি বেঁধে বসে পড়ো তুমি, আমরা আফগান-সন্ধ্যা কাটাই।’’

আর একবার, সুনীলদা বললেন, ‘‘চলো, তোমাকে একটা দারুণ জায়গায় নিয়ে যাই।’’ বিকেল বিকেল ট্রেনে রওনা হলাম আমরা। তখন তরুণ-যুবকদের ভিতর চল হয়েছিল গলায় রুমাল বাঁধার। এমনি রুমালের চেয়ে ঢের বড় সাইজের সেই রুমাল, সেগুলি আরও বাহারি, মেয়েরাও মাথায় বাঁধতেন। ট্রেনে ওঠার আগে সুনীলদা স্টেশন থেকে ওই রকম দুটো রুমাল কিনে নিয়েছিলেন। আমরা বেশি দূর নয়, নামলাম গিয়ে চন্দননগর স্টেশনে। সেখান থেকে সোজা পশ্চিমের রাস্তা ধরে রিকশয় দিল্লি রোডের গায়ে সুগন্ধা গ্রাম। সেই গ্রামের প্রান্তে ঢেউ খেলানো উঁচু নিচু জমি। সে জমিতে কয়েকটি খেজুর গাছ। তারই ফাঁকে কয়েকটি বেঞ্চ ও নড়বড়ে কাঠের টেবিল এবং একটি টালির ছাদযুক্ত দোকানঘর— সব মিলিয়ে অবাক করে দেওয়া একটি পানশালা। 'উটের মধুর আরব এসেছে কাছে'— শক্তি চট্টোপাধ্যায়েরই কবিতার পঙক্তি বিড় বিড় করতে করতে সুনীলদা আমাকে নিয়ে গিয়ে বসালেন পানশালাটির বেঞ্চে। তার পর নিজের মাথায় ডোরাকাটা মস্ত রুমালটি দুপাশে ঝুলিয়ে বেঁধে, অপর রুমালটি আমাকেও ওভাবে বাঁধতে নির্দেশ দিয়ে সুনীলদা বললেন, ‘‘আরবে রিয়াধে, জেদ্দায় বেদুইনরা এভাবে মদ খায়, মরুভূমিতে হাইওয়ের ধারের পাবে।’’ অদূরে দিল্লি রোডে তখন ট্রাক লরি যাচ্ছিল। গেলাসে চুমুক দিতে দিতে সুনীলদা বললেন, ‘‘ওই দ্যাখো তেলের ট্যাংকার যাচ্ছে!’’ সত্যিই একটা ট্যাংকার যাচ্ছিল।

শ্রীরামপুর ই এস আই হাসপাতাল আমাদের বাড়ির লাগোয়া। একদিন সকালে সেখান থেকে খুব হই হই শুনে গিয়ে দেখি সুনীলদার ছোট মেয়ে সোমার এক দুর্ঘটনা ঘটে গিয়েছে। বেশ আহত অবস্থায় ৫/৬ বছর বয়সি মেয়েটিকে সঙ্গে সঙ্গে ই এস আই হাসপাতালেই ভর্তি করা হয়েছে। হয়েছিল কী, ই এস আই হাসপাতালের ভেতর চওড়া চওড়া রাস্তা, সকালে বিকেলে ছেলেপিলেরা সাইকেল চালায়। সকালে ওই রাস্তায় সোমা তার বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াচ্ছিল, সাইকেলের ধাক্কায় সে ছিটকে পড়েছে। মাথায় প্রচণ্ড লেগে সে অচেতন। ওইটুকু মেয়ে, তাই ভয়। আমি যেতেই সুনীলদা বললেন, ‘‘তুমি এক্ষুনি শিবপুর যাও।’’ বলেই সুনীলদা খস খস করে তাঁর বাবাকে এক চিরকুট লিখলেন, ‘‘বাবা এর নাম মৃদুল, এ পৌঁছনো মাত্র এর হাতে ১০ হাজার টাকা আমার জন্য দিয়ে দাও। আমার দরকার।’’ মাঝ সত্তর দশকের ১০ হাজার টাকা— সে অনেক, সে অনেক! শিবপুরে সুনীলদাদের বাড়ির ঠিকানা লাগে না, তাঁর বাবা, দাদারা অতি বিখ্যাত। উত্তরবঙ্গে চা বাগান তাঁদের, সুনীলদার এক দাদা টি বোর্ডের মেম্বার, চায়ের বিরাট ব্যবসা তাঁদের। তবু সুনীলদা শিবপুরে তাঁদের বাড়ির হদিশ আমাকে বুঝিয়ে দিলেন। এবং বলে দিলেন, কারও সঙ্গে বেশি কথা না বলে স্রেফ টাকা নিয়ে দ্রুত চলে আসতে। আমি জানতাম, বাড়ির অমতে বিয়ে করার জন্য বাড়ির সঙ্গে সুনীলদা-বৌদির যোগাযোগ তেমন ছিল না।


মদ ও তার উপযুক্ত অনুষঙ্গ। ছবি: পিক্সঅ্যাবে

শিবপুরে সুনীলদাদের বাড়ি পৌঁছে তাঁর বাবার খোঁজ করতে দু’এক জন কর্মচারী গোছের লোক কোথা থেকে এসেছি, আসার কারণ জিগ্যেস করলে, সুনীলদা পাঠিয়েছেন শুনেই তাঁর বাবার কাছে নিয়ে গেলেন। ইজিচেয়ারে বসা বৃদ্ধ মানুষটি চিঠিটি পড়ে আমার দিকে চোখ বোলাতে লাগলেন। বুঝলাম জরিপ করছেন। সুনীলদা পাঠিয়েছেন— সাবেকি বাড়ির অন্দর মহলে সে খবর পৌঁছে গিয়েছে, তা টের পেলাম মহিলাদের উঁকিঝুঁকিতে। সুনীলদার বাবা এক পরিচারিকাকে ডেকে আমাকে সুনীলদার মায়ের কাছে নিয়ে যেতে বললেন। সুনীলদার মা আমার কাছ থেকে ছেলের নানা খোঁজ খবর নিলেন। মেয়ের দুর্ঘটনার খবর সুনীলদা তাঁর বাবা-মা তো বটেই, কাউকেই না বলতে নির্দেশ দিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু সুনীলদার বৌদিরা আমাকে প্রায় জেরা করে ছুটকি অর্থাৎ সোমার দুর্ঘটনার বিষয়টি হালকাভাবে জেনে গেলেন। আমি তাঁদের বললাম, তেমন কিছু চোট লাগেনি। ডাক্তাররা বলেছেন, ভয়ের কিছু নেই। সুনীলদার মা-বাবাকে কিছু জানাতে বারণ করে দিলাম আমি।

ইতিমধ্যে সুনীলদার বাবা ভেতর-বাড়িতে চলে এসেছিলেন। আমি তাঁকে বললাম, সুনীল আমাকে তাড়াতাড়ি ফিরতে বলেছেন। সুনীলদার বাবা বললেন, এই সময়ে এ বাড়িতে এসে কেউ না খেয়ে যায় না। অতএব মধ্যাহ্নভোজন। তার বিবরণ নিষ্প্রয়োজন। আমি খেতে বসার আগেই একটি লোক এলেন, বেশ লম্বাচওড়া দেখতে। সুনীলদার বাবা বললেন, ‘‘বলরাম, আমি তোমার খবর করছিলুম।’’ আমার দিকে তাকিয়ে সুনীলদার বাবা বলরামকে বললেন, ‘‘এ হচ্ছে মৃদুল, শ্রীরামপুরে থাকে, সুনীল পাঠিয়েছে।’’ তারপর সুনীলদার বাবা বলরামকে নিয়ে কথা বলতে বলতে অন্যদিকে চলে গেলেন।

আমার খাওয়া হতেই সুনীলদার বাবার কাছে গেলাম। তিনি একটি বাজারের আনাজপাতি ভরা ব্যাগ আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘‘এর ভেতর টাকা আছে। ১০ নয়, আমি ২০ দিয়েছি।’’ বলে আলু, পেঁয়াজ, বেগুন সরিয়ে টাকার খামটি দেখিয়ে ফের আলু, পেয়াজ সাজিয়ে বললেন, ‘‘সাবধানে নিয়ে যেও।’’

আমি বাসে হাওড়া স্টেশন গেলাম। হাতে বাজারের ব্যাগ, ট্রেনে ভেন্ডার কামরায় উঠলাম। শ্রীরামপুরে নামব, হঠাৎ দেখি গেটের কাছে বলরাম দাঁড়িয়ে। আমার সঙ্গে বলরামও নামলেন। হেসে আমাকে বলরাম বললেন, ‘‘এসে গেল শ্রীরামপুর। এবার খোকা, তুমি তো নিজেই যেতে পারবে। হাওড়ার ফিরতি ট্রেন ধরতে বলরাম অন্য প্ল্যাটফর্মে চলে গেলেন।’’

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -