SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

কে ছিলেন সেই নরেন দা?

নভেম্বর ২০, ২০১৫
Share it on
‘আমাদের তিন জনের তর্জনি ছুঁয়ে থাকা রবারের হাল্কা ছিপিটা কাঁপতে লাগলো। কোনওমতে কম্পিতকণ্ঠে বললাম, কেউ কি এসেছেন?’’

সোনার সঙ্গে যেমন সোহাগা, বিরিয়ানির সঙ্গে যেমন আলু, তেমনি ভূতের সঙ্গে  প্ল্যানচেট-ছোটবেলা থেকে  এ কথা শুনে আসছি। আমার বাবা  এক কালে রাত জেগে এই পদ্ধতিতে ভূতের সঙ্গে ভাব বিনিময় করতেন, কিন্তু তা আমার জন্মের আগের ঘটনা। প্লানচেটের নানা উপাখ্যান পড়তাম , তাতে  রোমাঞ্চ  বাড়ত। মনে আছে, গৌরাঙ্গপ্রসাদ ঘোষের প্লানচেট নিয়ে লেখা গল্প “ভূত নিয়ে খেলা” পড়ে দারুণ ভয় পেয়েছিলাম।

বি এ পাশ করে যখন নিজেকে বেশ লায়েক মনে হচ্ছে, তখন আলিপুরের ন্যাশানাল লাইব্রেরিতে অফুরন্ত ভূতুড়ে বইএর সন্ধান পেয়ে গেলাম। তার মধ্যে কিছু হাতে কলমে ভূত নামাবার  বইও ছিল। ওই কাল-প্রাচীন বাড়িটিতে ওয়ারেন হেস্টিংস-এর আমলের কিছু প্রেতাত্মা বসবাস করত বলে গুজব ছিল। তখন আজকের ভাষা ভবন বানানো হয়নি, পড়াশোনা করতে হত পুরনো কাঠের মেঝেওয়ালা হলঘরে। সন্ধ্যার পর রিডিং রুম খালি হতে শুরু করলে বেশ গা ছমছম করত। কিন্তু প্রক্রিয়াগুলো যাচাই করে নিতেও মন উসখুশ করত। সমস্যা দেখা দিল স্থান এবং সঙ্গী নিয়ে।  আমাদের ছোট ফ্ল্যাটবাড়িতে এ রকম উচ্চচিন্তা করা সম্ভব ছিল না।

এমন সময়েই এক বিকেলে অপ্রত্যাশিতভাবে স্কুলের এক পুরনো  বন্ধুর সঙ্গে দেখা, প্রায় দশ বছর পরে। কথায় কথায় জানলাম তার বাড়ির ছাদের ঘরের উপরে তার একছত্র অধিকার রয়েছে, সে ঘরে বাড়ির কেউ ভুলেও যায়না। দুই রবিবার বিকেলে রেকি করে নিশ্চিন্ত হলাম,তার দাবি সম্পূর্ণ সত্য। যখন বন্ধুটিকে আমার আসল উদ্দেশ্য জানালাম, তাখন তার উৎসাহ  দেখলাম আমার চেয়েও বেশি।  সে ঘোষণা করে দিল, আগামী রবিবারেই ওই  ঘরে প্রেতচক্রের প্রথম অধিবেশন বসবে। যখন আমি দ্বিধাভরে বললাম যে রাজপুত্রের সংখ্যা কিছু কম পড়িতেছে , চক্রে অন্তত তিন জন হলে ভাল হয়,সে তার দায়িত্বও গ্রহণ করল। এর পরে আর চিন্তার অবকাশ থাকতেই পারেনা।

আমার বন্ধুটির নাম ছিল—ছিল বলছি কেন, সে এখনও আছে—কাঞ্চন। রবিবার বিকেলে কাঞ্চনের বাড়ি গিয়ে  ছাদের এঁদো খুপরি ঘরটাকে আর চিনতেই পারিনা। সব কিছু ঝকঝক করছে, হাওয়ায় ধুপ-ধুনোর সুবাস, দেওয়ালে রবীন্দ্রনাথের ফটো, তাতে রজনীগন্ধার মালা দুলছে। সব রেডি, টেবিলে মোমবাতি দেশলাই পর্যন্ত, যাতে ভূত ঘরে ঢুকে পড়লে তার মুখটা দেখা যায়। ঘরের মধ্যে আমাদের বয়সি একটি ছেলে বসেছিল, কাঞ্চন তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল, সে ওর মাসতুতো ভাই,  আমাদের ত্রিভুজের তৃতীয় বাহু। এবার শুরু করলেই হয়।

  কাঞ্চন  আবদার করল, রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে আমাদের শ্রীগণেশ করা উচিত, এ রকম ওপেনিং ব্যাটসম্যান পেলে ম্যাচ জমে যাবে। আমরা এক ঘণ্টা সেই ছায়ান্ধকার ঘরে রবিস্মরণ করলাম। কিন্তু কোনও ফল হল না, গুরুদেবের কতকগুলো চ্যাংড়ার সঙ্গে আড্ডায় বসতে আগ্রহ দেখা দিল না।অনেকক্ষণ মশার কামড় হজম করে আমরা হাল ছেড়ে দিলাম। মোটে সাতটা বেজেছে, বাড়ি ফেরার মুড নেই।  ঠিক করলাম কোন বিশেষ আত্মার কথা না-ভেবে সাধারণভাবে প্রেতলোক নিয়ে ধ্যান করবো।

  পাঁচ মিনিটও কাটল না, আমাদের তিন জনের তর্জনি ছুঁয়ে থাকা রবারের হাল্কা  ছিপিটা কাঁপতে লাগলো। কোনমতে কম্পিতকণ্ঠে বললাম, কেউ কি এসেছেন?

ছিপি ধীরে ধীরে আমাদের বানানো বৃত্তাকারে সাজানো বর্ণমালার উপর ঘুরতে ঘুরতে বানান করে দিল-কি জানতে চাও?

এ তো মেঘ না চাইতেই কফি! (সে বয়সে তার চেয়ে উত্তেজক পানীয়র স্বাদ তো পাইনি) ঘোর উত্তেজিত হয়ে আমরা প্রায় সমস্বরে আমাদের প্রশ্নের ঝাঁপি উজাড় করে দিলাম। তিনি শান্তভাবে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিলেন।  প্রশ্নগুলি মামুলিই ছিল, কিন্তু আমরা মহা-ইম্প্রেসড। হাজার হোক,  ভূতের সঙ্গে  প্রথম কথা, ডাক্তারি ছাত্রের প্রথম মড়া কাটার  সমতুল্য।

প্রশ্নাবলি সমাপ্ত হওয়ার পরে যথাবিহিত ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম, ভবিষ্যতে তাঁকে ডাকার জন্য কী করতে হবে। খানিক  নীরবতার  পর উত্তর এল— ‘‘আমাকে নরেন-দা বলে ডাকলেই  আমি আসব।’’

এই সুত্রপাত। এর পরের পাঁচ বছরে বহুবার আমি নরেনদার সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি বিন্দুমাত্র বিরক্ত না হয়ে আমার কৌতূহল মিটিয়েছেন। তিনি যা ঘটবে  বলেছেন, তার শতকরা নিরানব্বইভাগ মিলে গেছে। আমি কী পরীক্ষা দেব, কী চাকরি পাব, সব কিছু তিনি নির্ভুলভাবে বলে দিয়েছেন অন্তত ঘটনার এক বছর আগে। শুধু আমি নই,আমার বন্ধুদের সম্বন্ধেও তাঁর ভবিষ্যৎদর্শন এতটাই নিখুঁত হয়েছে। আরও দেখেছি স্থান তাঁর কাছে কোনও ব্যাপার নয়। কাঞ্চনের বাড়ি ছাড়াও তাঁর সঙ্গে আমার কথোপকথন হয়েছে মুসৌরি ও  দিল্লিতে। সর্বত্রই তাঁর অবাধ গতি।

কিন্তু এত সুখ আমার কপালে সইল না। একটি বিশেষ  প্রশ্ন, আমার কাছে তখন যার গুরুত্ব অপরিসীম তার বিষয়ে উত্তর আমার মনোমত হয়নি। তাই আমি অভিমান করে কিছুদিন কথা বন্ধ করি।  অচিরেই তাঁর কথাই সত্য প্রমাণিত হল। আমি গভীর আঘাত পেয়ে প্রেতচর্চাই বন্ধ করে দিলাম। এখন বুঝি, নরেনদার কাছে সত্যটাই বড় ছিল, আমার মনোরঞ্জন নয়। পরে অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু আর কখনও যোগাযোগ  হয়নি।

অবসন্ন জীবনের  গোধূলি বেলায় দাঁড়িয়ে  মাঝে মাঝেই ভাবি নরেন দা কে ছিলেন কিন্তু প্রথম দিনের সূর্যের মত কেউ দিল না উত্তর।

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -