SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

চেঁচিয়ে, বুক বাজিয়ে, মুখ সাজিয়ে

নভেম্বর ২০, ২০১৫
Share it on
রাত ৯.২৬। ৩২টা লাইক। ১৮টা কমেন্ট। যথা – ১) রিপ ২) রিপ ৩) রিপ... ... ... ১৮) রিপ

‘‘আজ সকাল থেকেই টুসকির শরীরটা খারাপ। দুধের বাটিটা একবার শুঁকেই খাটের তলায় শুতে চলে গেল। কী যে করি!’ — শর্মি সাহা। বয়স ৩৬। গৃহবধূ। সকাল ৮.০৩।

সকাল ৮.৩৭। ৬২টা লাইক। ৩৬টা কমেন্ট। যথা — ১) ইশ্‌শ্‌! ২) এ বাবা! ৩) কী মিষ্টি টুসকিটা। ৪) আমিও তো মাঝেমাঝে দুধ রিফিউজ করি!  ৫) কিচ্ছু ভাবিস না মামনি, ও ঠিক হয়ে যাবে। ৬) একদম ফেলে রাখিস না শর্মি! ডাক্তার দেখিয়ে নে।

‘‘টুসকি দুধ খেয়েছে। আসলে  কিছুই হয়নি। কাল আমি ওকে বকেছিলাম তো, তাই অভিমান করেছিল মেয়েটা’’ — শর্মি। সকাল ১০.৩১।

সকাল ১০.৫২। ৮০টা লাইক। ৬৩টা কমেন্ট। যথা – ১) যাক বাবা! ২) থ্যাঙ্ক গড ৩) কী কিউট! ৪) তা হলেও, একবার ডাক্তার দেখিয়ে নিস। ৫) কেন যে বকিস তুই মেয়েটাকে? ককার স্প্যানিয়েলরা এমনিতেই একটু অভিমানী হয়। কুকুর বলে কি আর মানুষ না?

— আচ্ছা, কুকুর অভিমান করে দুধ খায় না, এটা কি সত্যি?

— একদম সত্যি। কুকুরের সেনসিটিভিটি প্রায় মানুষেরই মতো।

— তোর মা তো দেখেছি রাগমাগ করে মাঝেমধ্যে রাতে খায় না। কুকুরও যে তা-ই করে, এটা জানতাম না।

— আহ্‌ বাবা! কোথায় কুকুর, আর কোথায় মা! তুমি একটা জংলি ভূত।

— যাক, টুসকি  দুধ খাচ্ছে। এত লোক নিশ্চিন্ত হল, এটাই বা কম কী!

‘‘এপিজে আবদুল কালাম চলে গেলেন’’ – অনুপম পাল। বয়স ৪৫। চাকুরীজীবী। রাত ৯.০৫।

ছবি: সু্মন চৌধুরী

রাত ৯.২৬। ৩২টা লাইক। ১৮টা কমেন্ট। যথা – ১) রিপ ২) রিপ ৩) রিপ... ... ... ১৮) রিপ

— রিপ আবার কী?

— ধুস, তুমি একটা ঢোলগোবিন্দ। রিপ হল আর আই পি। রেস্ট ইন পিস। মানে, এপিজে-র আত্মা যেন শান্তিতে থাকে।

— ও, তাই বল। তো সেটা লেখা যায় না?

— অত সময় কারও আছে নাকি? যেখানে তিনটে অ্যালফাবেটে  কাজ সারা যায়, সেখানে পাঁচ-ছ’টা বাংলা শব্দ কে লিখতে যাবে?

— তা-ও ঠিক। আচ্ছা, এটা তো শোকসংবাদ। এটাতে ‘লাইক’ কেন?

— উফ্‌ফ্‌ফ্‌, এটা খবরটাকে লাইক  করা  নয়। যে খবরটা এখানে দিয়েছে, তার অনুভূতিটাকে লাইক  করা। হি ওয়াজ সেনসিটিভ এনাফ টু শেয়ার হিজ ইমোশনস।

— বোঝো!!

‘নির্বাক দেখে এলাম। জাস্ট  ফাটাফাটি। ঋত্বিক তো সিম্পলি  সুপার্ব। আবার দেখব। এবার বাপিকে নিয়ে  যাব।’’ ঐশ্বর্যা বসু। বয়স ১৮। সন্ধ্যা ৬.১৮।

ঐশ্বর্যা সুন্দরী। স্বাস্থ্যবতী। আমার মেয়ে চেনে।

সন্ধ্যা ৬.৩০। ১০০টা লাইক। ৬৬টা কমেন্ট।  যথা – ‘আমারও দারুণ লেগেছে রে, আবার দেখব’ — অভিষেক সেনগুপ্ত। বয়স ১৮।

‘‘নির্বাক দেখছি। এখন ইন্টারভ্যাল। কী যা তা ছবি। কেন যে লোকে পয়সা খরচ করে এসব ছাইপাঁশ বানায়? বিরক্ত লাগছে। যাই, পপকর্ন খাই।’’ — আত্রেয়ী দাশগুপ্ত। বয়স ১৮। রাত ১০.৩০।

আত্রেয়ী সুন্দরী। ঐশ্বর্যা-র চেয়েও স্বাস্থ্যবতী। ওকেও আমার মেয়ে চেনে।

রাত ১০.৩৭। ৬৫টা লাইক। ৪৪টা কমেন্ট। যথা — ‘‘আমারও একদম যা তা লেগেছে’’ — অভিষেক সেনগুপ্ত।

ঐশ্বর্যা আর আত্রেয়ী পরস্পরকে চেনে না।

— এই অভিষেক ছেলেটা দু’জনকে দু’রকম কথা লিখল কেন? লোকে তো দেখতে পাবে যে ও একই ছবি সম্পর্কে দু’জনকে ঠিক উলটো কথা বলছে।

— হু কেয়ারস? ওর তো দরকার এই দু’জনের মধ্যে যে কোনও একজনকে। খোঁজ নিয়ে দেখো, ও ‘নির্বাক’ আদৌ দেখেছে কি না।

— সে কি রে! এ রকম জলজ্যান্ত মিথ্যে কথা বলে দেবে? পাবলিকলি?

— তাতে কী? হাজার হাজার পোস্ট মিনিটে মিনিটে। অত কেউ খেয়াল রাখে নাকি?

— ব্রিলিয়ান্ট!    

‘‘বিশ্বাস কর সোনা, আমি এভাবে বলতে চাইনি। তুই যদি এরকম ভুল বুঝিস তো আমি একদিন ঠিক মরে যাব। তখন বুঝবি, হাউ মাচ আই লাভ ইউ’’ — শৌনক পূততুণ্ড। রাত ২.৫৭।

‘‘তোকে আর বিশ্বাস করা যায় না। তুই কাল মোনালিসাকে কিসি করিসনি? আমি সব জানি’’ — পৌলোমী দত্ত। রাত ২.৫৮।

‘‘কে বলল তোকে? তোকে ছাড়া আমি কাউকে চুমু খাইনি কখনও’’ — শৌনক।

‘‘ইল্লি আর কী! কী আমার রামচন্দর এলেন রে! ন্যাকাষষ্ঠী!’’ — পৌলোমী।

‘‘আচ্ছা, তুই বল তুই আমারই আছিস’’ — শৌনক।

‘‘তুই আগে কনফেস কর তুই কাল মোনালিসাকে কিসি করেছিস’’— পৌলোমী।

‘’ওয়েল। ওটা জাস্ট একটা ফ্রেন্ডলি পেক অন দ্য চিক। আই হ্যাভ নাথিং উইথ হার। আই লাভ ইউ’’— শৌনক।

‘‘দেন প্রুভ ইট’’ — পৌলোমী।

‘‘কী প্রুফ চাস বল’’ — শৌনক।

‘‘কাল কলেজ ক্যান্টিনে মোনালিসার সামনে আমাকে কিসি করবি তুই’’— পৌলোমী।

‘‘ওকে ডান’’ — শৌনক।

— এরা কারা?

— এরা আমার সঙ্গে কলেজে পড়ে। ব্যাচমেট।

— হুম্‌ম্‌। তোদের কলেজে প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া অ্যালাউড?

— না কেন? চুমু খাওয়াটা ক্রাইম নাকি?

 ছবি: সু্মন চৌধুরী

 

— না ঠিক ক্রাইম নয়, কিন্তু একটা সাবলাইম ব্যাপার তো — এভাবে, সবার সামনে...

— এখন সময় পালটে গেছে বাবা। তোমাদের মত ভোঁদু নাকি সবাই?

— আচ্ছা, এই দুটো ছেলেমেয়ে, এদের কি কোনও লজ্জাশরম নেই? মানে, এইখানে এইভাবে পাবলিকলি এইসব কথা বলা...

— এর সঙ্গে লজ্জাশরমের কী সম্পর্ক? মনের কথা মুখে বলছে। কে দেখছে, কে পড়ছে, কিচ্ছু যায় আসে না। দিস ইজ অনেস্টি বাবা।

— অনেস্টি মানে কি ছাদে দাঁড়িয়ে চোঙা ফুঁকে পাড়ার লোককে জানানো যে, আমার আজ পেট খারাপ? সকাল থেকে চার বার গেছি?

— তোমার ইচ্ছে হলে তুমি জানাতেই পারো। নো ওয়ান ইজ স্টপিং ইউ।

আমি পুলকিত। শিহরিত। সারা গা কাঁটান্বিত। যাকে ভদ্র ‘লিংগো’-য় বলে রোমহর্ষিত। এর পরেও কি হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা যায়? মেয়ের কাছ থেকে শিখলাম কী করে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়। মেয়েই ছবিটবি লাগিয়ে দিল। কিন্তু কী হল জানেন? পরশু সন্ধেবেলা অ্যাকাউন্টটা খুলেছি, আর কাল সকালেই বাথরুম থেকে বেরোতে গিয়ে পিছলে পড়ে বাঁ হাতটা কম্পাউন্ড ফ্র্যাকচার। সে এক বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার। এখন তো প্লাস্টার করে না। ঝুলিয়ে রাখে। আমিও একটা দামি ব্যাগে হাত ঝুলিয়ে রেখেছি। কিন্তু অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যেও কাল একবার ফেসবুক খুলেছিলাম। স্টেটাস মেসেজ-এ লিখলাম — ‘‘আজ সকালে আমার হাত ভেঙে গেছে। অসহ্য যন্ত্রণা।’’ আজ একটু আগে ফেসবুক খুলে দেখি তাতে ৩টে লাইক। তার মধ্যে একটা আমার ছেলের, আর একটা আমার মেয়ের।

আর একটা কমেন্ট। আমার মেয়ের। ‘‘পুওর ড্যাড। গেট ওয়েল সুন।’’

 

 

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -