SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

বলিউডের গোপন রসায়ন থেকে বাঁচাতে জাহ্নবীর জন্য কি কোনও প্ল্যান রেখেছিলেন শ্রীদেবী

অগস্ট ৮, ২০১৮
Share it on
শ্রীদেবী কিন্তু মেয়ে জাহ্নবীর গ্র্যান্ড ডেবিউ-এর জন্য প্রযোজক ‘হাবি’ বনি কাপুরের কাছে হাত পাতেননি। ‘ধড়ক’-এর প্রযোজক কর্ণ জোহর।

শ্রীদেবীকে আমি প্রথম দেখেছিলাম ‘জুলি’ (১৯৭৫)-তে। নায়িকার বিশ্ব-পাকা বোনের ভূমিকায়। টরটরে, বিচ্ছু, শ্যামলা-রঙা বালিকাটির ১২-১৩ বছরের শরীরটায় তখন সদ্য বয়ঃসন্ধির ছোঁওয়া লেগেছে। তবে শরীর না হলেও শরীরের ভাষায়-চুল ঝাঁকিয়ে ঘাড় এলানোর ভঙ্গিতে, ঠোঁটের পাউটিং-এ, হাসির ধরনে, বার বারই বালিকার চপল-লঘু সারল্যের মেয়েবেলা টপকে যুবতী নারীদের নিষিদ্ধ আঙিনায় টুক করে নেমে পড়ার চেষ্টাটা লুকনো যাচ্ছিল না। খুকি মেয়েটা এমনকী ডাগর চোখের কটাক্ষে ‘পঞ্চম শর’ ছোড়ার প্র্যাকটিসটাও চালিয়ে যাচ্ছিল তখন থেকেই। তবে আজকাল টেলিভিশনের অনেক রিয়ালিটি শো-এ ছোট বাচ্চা মেয়েরা যেমন নায়িকাদের মতো প্রচুর সাজগোজ করে, একটুও মানেটানে কিচ্ছু না বুঝে, বলিউডি লাস্য-রসে টুসটুসে, সেক্সি-আদায়েঁ রগরগে, সব আইটেম নাম্বার নেচে দেখায়, ‘জুলি’-র ‘চাইল্ড-আর্টিস্ট’ শ্রীদেবীর  ‘পাকামো’-টা কিন্তু ঠিক সে রকমটা ছিল না।

কেরিয়ারের দায়ে, সংসারের দায়ে, সেই সঙ্গে ‘মেন্টর’ মায়ের প্রেরণা (বা প্ররোচনায়) শ্রীদেবীর তাড়াতাড়ি ‘বড় হয়ে যাওয়ার’ একটা তাগিদ ছিল। ‘জুলি’-তে সেই কিশোরী বা বালিকা-শরীরে যুবতী মন ‘ইমপ্ল্যান্ট’ করে দেওয়ার ঝাঁকুনিটাই আমরা টের পেয়েছিলাম। বেশ ক’বছর পরে ‘সদমা’ (১৯৮৩) ছবিতে শ্রীদেবীকে এর উলটো জার্নি-টাতেই দেখা যাবে— যেখানে ভরন্ত যুবতী শরীরে আলুথালু বালিকা-মন নিয়ে তিনি নায়ক কমল হাসানের জীবনটাকে এতোল-বেতোল করে দেবেন। তবে সে সব তো পরের কথা।প্রথম বার যখন ‘জুলি’ দেখছি, তখন তো আর শ্রীদেবীকে শ্রীদেবী বলে চিনি না। কেই বা চিনত! অনেক পরে যখন দূরদর্শনে আবার জুলি দেখলাম, ততদিনে তো আমরা ‘হিম্মতওয়ালা’, ‘তোহফা’, ‘সদমা’— এসব দেখে ফেলেছি। শ্রীদেবী তখন রোজ আমাদের স্বপ্নে হানা দেন। রিনরিনে কিশোরী গলায়, অস্ফুট, আদুরে উচ্চারণে কানের কাছে ভালবাসার কথা বলেন।


‘জুলি’ ছবিতে শ্রীদেবী ও অন্যান্য শিল্পী। ছবি: ইউটিউউব থেকে

তাই এইবার ‘জুলি’ দেখার সময় ফার্স্ট এন্ট্রিতেই ‘বেবি শ্রীদেবী’-কে চিনে নিতে দু-সেকেন্ডও লাগেনি। তখনও অবশ্য জানতাম না, চার বছর বয়েস থেকেই স্টুডিও ফ্লোর যার ঘরবাড়ি, খেলনাবাটি, নার্সারি ইসকুল বা দোলনা-স্লিপ-সি-স সাজানো চিল্ড্রেন্স পার্ক— ‘বেবি’ থেকে বলিউডের ‘দেবী’ পর্যন্ত পৌঁছোনোর জন্য সেই দক্ষিণী মেয়েটাকে কত কী সইতে হয়েছিল! জীবনের ষোলতম বসন্তে তিনি যখন নায়িকা হিসেবে প্রথম ব্রেক পাচ্ছেন ‘সোলভা শাওন’ (১৯৭৯) ছবিতে, ততদিনে বড়দের দুনিয়ায় অনেক আষাঢ়-শ্রাবণ, মেঘ-বৃষ্টি তিনি শরীর দিয়ে বুঝে নিয়েছেন। মেনে নিতে হয়েছে চিরকালের পুরুষ-শাসিত ইন্ডাস্টির অনেক অন্যায্য দাবি। আপোস করেই মেটাতে হয়েছে অনেক অন্যায় আবদার। কারণ, তিনি ‘ধড়ক্’-এর নায়িকা জাহ্নবী কপূরের মতো কোনও স্টার কিড নন। কারণ, তাঁর মা শ্রীদেবীর মতো বলিউডের কোনও সুপার-তারকা মহানায়িকা নন, তিনি স্রেফ মেয়ের কেরিয়ার নিয়ে অসম্ভব উচ্চাকাঙ্ক্ষী, মেয়েকে তারকা বানানোর জন্য যতদূর-যেতে-হয়-যাব -গোছের মানসিকতার একজন খুব সাধারণ কিন্তু ভীষন জেদি মা। তিনি তাঁর শাশুড়ির ব্যক্তিত্বকে কতদুর সমঝে চলতেন, এক টেলিভিশন শো-এ শ্রীদেবীর পাশে বসেই সেটা সাতকাহন করে শুনিয়েছিলেন স্বয়ং বনি কাপুর।

দক্ষিণের শ্রীদেবীর বলিউড অভিষেকের একযুগ আগে এরকমই আর এক জোড়া নাছোড় মা ও তাঁর অসহায় বাধ্য মেয়ের দক্ষিণী জুটি দেখেছিল বলিউডের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। জন্মসুত্রে বংশ-কৌলিন্যের বিচারে অবশ্য শ্রীমতী ভানুরেখা গনেশন নিঃসন্দেহে ‘স্টার-কিড’। কিন্তু তামিল মুভি-মুঘল জেমিনি গনেশনের মেয়ে হলেও জন্মের সময়ে কেউ তাঁর মুখে রুপোর চামচ ধরেনি। বরং বাবা তাঁকে কোনোদিন বৈধ মেয়ে বলে স্বীকারই করেননি। তাঁর চোখের সামনেই তারকা-বাবা টিপিক্যাল ফিলমি ভিলেনদের মতো মাকে চুলের মুঠি ধরে মারতে মারতে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন-মেয়ে সুদ্ধই। মা-ও ভারতবর্ষের আরও অসংখ্য বরে-খেদানো বউদের মতোই ‘দোর-দোর কি ঠোকর’ খেতে খেতে আরবসাগরতীরের রুপোলি নগরে এসে ঠাঁই নিয়েছেন।


রেখা, ছবি: উইকিপিডিয়া

আর মেয়ে বয়ঃসন্ধির চৌকাঠে পা রাখতে না রাখতেই তাকে বগলদাবা করে প্রযোজকদের দরজায় দরজায় ঘুরেছেন। সেইসব অসম্মান, নানারকম ‘কাস্টিং কাউচ’ বা কাউচ-এর চেয়েও অপমানকর কত না আপোস, আত্মসমর্পণের গোপন কান্না সামলাতে সামলাতেই কিশোরী মেয়েটা একদিন বড় হয়ে যাবেন। গাবলু-গুবলু,সেই শ্যামলবরণী দ্রাবিড়-কন্যা যে কখনও তাঁর কিশোরীবেলার ‘অসংস্কৃত’-আনাড়ি, কাঁচা স্ক্রিন-প্রেজেন্সকে বাই-বাই করে, নিজের লুক-এ একের পরে এক এডিটিং চালিয়ে, দেশি গ্ল্যামার দুনিয়ার ‘দিভা’ হয়ে উঠবেন, তাঁর শরীর ও অসহায়তা নিয়ে খেলা-ধুলো করা টিনসেল টাউনের মেজ-সেজ মাফিয়ারা ভাবতেই পারেননি। রেখা কিন্তু বলিউডের সেই একদা বিখ্যাত বাঙালি নায়কটির কীর্তিটা ভোলেননি, যিনি প্রযোজক-পরিচালকদের উস্কানিতে ফ্লোরের মধ্যে, ক্যামেরার সামনেই, ‘চিত্রনাট্যের প্রয়োজনের’ ছলে বছর চোদ্দর মেয়েটির শ্লীলতাহানি করেছিলেন।

এই যে রেখা ক্রমাগত নিজের শরীরকে পালটে-ভেঙে তাঁর চারপাশে এক মোহন-অলৌকিক মায়া ‘ক্যাপসুল’ নির্মাণ করলেন, যার আড়ালে তিনি এক অনন্তযৌবনা, ছায়াময়ী, কুহকিনী পুরাণদেবীর মতো বাস করেন, যাঁকে একটু দেখার জন্য কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত ভারতীয় পুরুষ এই বাসনা-কুমারী, কামনা-দেবীর দোপাট্টাটাই গলায় জড়িয়ে ফাঁসি যেতেও প্রস্তুত ছিল— বলিউডের পুরুষ-শাসন, শোষনের বিরূদ্ধে এটাই রেখার প্রতিশোধ। কোন নারীবাদী হাঁকডাক নেই। বিলকুল মেয়েলি। কিন্তু মোক্ষম অব্যর্থ। তা ছাড়া রেখা যে তাঁর ভরা যৌবনেই বলিউডের সবচেয়ে মহাকায়, মহা-মেগাতারকা থেকে দু-চারখানা খুচরো বিয়ের গুজব সুদ্ধ গোটা পুরুষ-পৃথিবীটাকেই বেপাত্তা করে দিলেন— তাঁর জীবনে পুরুষদের শরীরটাকে স্রেফ সেক্স-টয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বই দিলেন না— এটাও তো কিছু কম অন্তর্ঘাত নয়!

লেখকের অন্যান্য ব্লগ

তবু আমার খুব কল্পনা করতে ইচ্ছে হয়। ধরুন, রেখার যদি একটা মেয়ে থাকত আর একলা মা হিসেবে রেখা তাকে বলিউডে ‘লঞ্চ’ করতে চাইতেন তা হলে তারকা-মা ও তারকা-সন্তান বনাম বাকি বলিউডের ইকুয়েশন-টা ঠিক কী দাঁড়াত? কারণ, এমনিতে মুম্বাইয়ে(বা অন্যান্য জায়গাতেও)তথাকথিত স্টার-কিড বা ‘তারকা-বাচ্চাদের’ সিনেমায় নামার ব্যাপারটায় বড্ডই পুরুষতান্ত্রিক গন্ধ আর বংশগরিমার দেমাকি দাপাদাপি। কপূর-খানদানের কেসটাই দেখুন। পৃথ্বীরাজ কপূরের তিন ছেলে, রাজ কপূরের তিন ছেলে, ঋষি কপূরের এক সন্তান, বংশানুক্রমে সবাই তারকা। তারকা-বাবারা তাঁদের পরের প্রজন্মকে স্টার বানিয়েছেন। কিন্তু বাড়ির মেয়ে-বউদের জন্য সিনেমায় ‘নো এন্ট্রি’। এমনকী, স্টার-ছেলেরা স্টার নায়িকাদের সঙ্গে অফ্ দ্য স্ক্রিন রোমান্স করে তাকে বাড়ির বউ করে আনলেও ভবি ভোলার নয়। পর্দায় ভাসুরের সঙ্গে ঢলাঢলি প্রেম করে এলেও এক বার করূর বাড়ির বউ হয়ে যাওয়ার পরে আধগলা ঘোমটা টেনে, শ্বশুর-ভাসুরের সেবা করে, শাশুড়ি-জা-ননদিনী-বাহিনী সামলে, আদর্শ গৃহলক্ষ্মী ইমেজটাই খাড়া রাখতে হয়। এর মধ্যেও বিদ্রোহের ব্যানার টাঙিয়ে, নিজের দাম্পত্যকে পর্যন্ত বাজি রেখে, করিশ্মা-করিনা দুই মেয়েকেই সিনেমায় নামিয়েছেন ‘মিসেস রনবীর’ ববিতা। তাঁর কেরিয়ারে যেভাবে আচমকা দাঁড়ি পড়ে গিয়েছিল, মেয়েদের বেলায় সেটা কিছুতেই হতে দেননি।অবশ্য শ্বশুরমশাই রাজ বেঁচে থাকলে ববিতার এই দ্রোহ কদ্দুর ধোপে টিকত, কে জানে!

তবে ববিতার বিপ্লবটা একেবারেই ব্যতিক্রমী। কারণ, নায়ক অনিল কপূরের মেয়ে সোনম থেকে ভিলেন শক্তি কাপুরের লাডলি শ্রদ্ধা, তারকা-কন্যারা তাঁদের বাবাদের পরিচয়েই উদ্ভাসিত হয়ে এসেছেন। স্বামী পরিত্যক্তা, প্রায় ‘সিঙ্গল মাদার’ ডিম্পল কাপাডিয়া মেয়ে টুইঙ্কলকে অনেকটাই একা-একাই পর্দায় নিয়ে এলেও, সেটা কিন্তু বাইরের গল্প। আসলে ডিম্পলের তখনকার প্রেমিক সানি দেওল তথা গোটা ধর্মেন্দ্র পরিবার আর তাঁদের প্রোডাকশন হাউস পুরোদস্তুর পাশে না থাকলে ডিম্পলের একার পক্ষে সবটা সামলানো সম্ভব ছিল না।


‘ধড়ক’ ছবিতে জাহ্নবী কপূর, ছবি: ইউটিউব থেকে

শ্রীদেবী কিন্তু মেয়ে জাহ্নবীর গ্র্যান্ড ডেবিউ-এর জন্য প্রযোজক ‘হাবি’ বনি কাপুরের কাছে হাত পাতেননি। ‘ধড়ক’-এর প্রযোজক কর্ণ জোহর। মরাঠি ছবি ‘সাইরাত্’-এর এই হিন্দি রিমেক-এ লোকেশন, মহারাষ্ট্রের অজ পাড়া-গাঁ ছেড়ে পাড়ি দিয়েছে রাজস্থান, পর্যটনের মাথার মণি উদয়পুরে। ‘লমহে’, ‘চাঁদনি’-র নায়িকা নাকি ধড়ক্-এ মেয়ের রাজপুতানি ‘লুক’ নিখুঁত করার জন্য অনেক টিপস-ফিপস ভেবেছিলেন। তবে কতটা বলে যেতে পেরেছিলেন, জানা নেই। মেয়েকে সাজিয়ে-গুজিয়ে প্রিমিয়ার-এর ছাঁদনাতলা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার বাসনাটাও অপূর্ণ থেকে গেল।

তবু, শ্রীদেবীর মেয়ের প্রথম ছবির বিষয় হচ্ছে, ‘অনর কিলিং’। এই সিদ্ধান্তটাতেই তো একটা ছকভাঙার সাহস রয়েছে। পরিচালক শশাঙ্ক খৈতান সাইরাত্-কে বলিউডি বানাতে যতই নয়নসুখ লোকেশন বাছুন, জাতপাতের টেনশন যতই কমিয়ে আনুন, জাহ্নবীকে ছবির অর্ধেকটা তো ডি-গ্ল্যামারাইজড্ রাখতেই হয়েছে। তা ছাড়া জাহ্নবী ক্যামেরার কোনো অ্যাঙ্গওল থেকেই শ্রীদেবীর মত রূপসী নন। তো এই মেয়ের কেরিয়ার নিয়েও মা-কে নিশ্চয়ই স্টার-কিডের ফর্মূলা ভাঙার অনেক কিছু ভাবতেই হচ্ছিল। সেই ভাবনাগুলোও জানা হল না। জাহ্নবী কি কিছু জানেন?   

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -