SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

এই বেশ ভাল আছি: আমেরিকার মেয়েরা

জানুয়ারি ৯, ২০১৬
Share it on
আমেরিকা সম্পর্কে বেশির ভাগই হয় অতিরঞ্জিত, নয়তো ঊর্বর মস্তিষ্কের কল্পনাপ্রসূত। হলিউডের সস্তা ছবির কল্যাণেও নেগেটিভ কথাবার্তার প্রচার হয়েছে বেশি।

অনেকের আমেরিকা সম্পর্কে সব অদ্ভুত অদ্ভুত ধারণা আছে। আমেরিকাতে যারা থাকেননি, এবং বিশেষ করে দীর্ঘ সময় থাকেননি, তাঁদের মধ্যেই আমি অনেক আশ্চর্য কথা বলতে শুনেছি। আমেরিকার সভ্যতা সম্পর্কে। আমেরিকার জীবনযাত্রা সম্পর্কে। আমেরিকার সমাজ সম্পর্কে। এবং বিশেষ করে আমেরিকার নরনারীর সম্পর্ক এবং যৌনতা সম্পর্কে।

এসব কথার বেশির ভাগই হয় অতিরঞ্জিত, নয়তো ঊর্বর মস্তিষ্কের কল্পনাপ্রসূত। হলিউডের সস্তা ছবির কল্যাণেও নেগেটিভ কথাবার্তার প্রচার হয়েছে বেশি। তার উপরে রয়েছে এখনকার নতুন যুগের মার্কিনি সস্তা টিভি শো।

আমি আমার তিরিশ বছরের আমেরিকা-প্রবাসে দেশটাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। ছেলেদের, মেয়েদের। সাদা, কালো, আমাদের মতো ইমিগ্র্যান্ট সমাজের মানুষকে। তার কিছু কিছু না লিখলে এসব ধারণা যেমন ছিল তেমনই থেকে যাবে বলে মনে।

S-এর কথা

একটা মেয়েকে চিনি গত সাত আট বছর ধরে। আমার এই লং আইল্যান্ড উইকেন্ডের কলিগ। নাম ধরা যাক S।

S এখন বত্রিশ কি তেত্রিশ। যখন প্রথম দেখি ওকে, তখন ছিল পঁচিশ। সেই বয়েসেই S সাত আট বছর একটা বিরাট হোটেলের ম্যানেজারি করে ফেলেছে। সেই হোটেলে তিনশোটা ঘর ছিল। তার কাজ দেখে ইমপ্রেসড হয়ে তাকে আমাদের এই বিরাট ইউনিয়নের এডুকেশন সেন্টারে চাকরি দেওয়া হলো ডিরেক্টর পদে। এখানে S দশ-বারো জনের ডিরেক্টর হয়ে কাজ করবে চল্লিশটা ঘর, বিশাল একটা প্রাসাদের মতো কনফারেন্স সেন্টার, সুইমিং পুল, কাফেটেরিয়া, বাগান, নেচার ওয়াক ইত্যাদির সর্বময় কর্ত্রী হিসেবে। S-এর অধীনে যারা কাজ করবে, তারা প্রত্যেকেই প্রায় ওর থেকে বয়েসে বড়, আর কলেবরে ওর প্রায় তিনগুণ।

S-এর বয়ফ্রেন্ডের নাম কী যেন। উচ্চতায় ছ’ফুট তিন ইঞ্চি, রং ময়লা, মাতৃভাষা বাংলা। এই যাঃ, ভুল হয়ে গেল। রং ফর্সা, লং আইল্যান্ড মার্কিনি যুবক। ওরা একসঙ্গেই থাকত। বিয়ে টিয়ে হবে একসময়ে। এবং S হল প্রেগন্যান্ট। এই সময়ে সেই যুবকের সঙ্গে তার সিরিয়াস প্রবলেম দেখা দিল এবং S আলাদা থাকতে আরম্ভ করলো। আমার কাছে দুঃখ করত ,এই সময়ে বয়ফ্রেন্ড ওর পাশে থাকল না। ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু বয়ফ্রেন্ডের মা ওর পাশে আছেন। আর S-এর নিজের মা-বাবা ও বন্ধুরা তো রয়েছেই।

সম্পূর্ণ একা একা একটা ছাব্বিশ সাতাশ বছরের মেয়ে এত বড় একটা দায়িত্বের কাজ সামলে, একদিনও কাজে কামাই না করে, সত্তর মাইল গাড়ি চালিয়ে দুবেলা কাজে যাওয়া আসা করে একটি মেয়ের জন্ম দিল। ডেলিভারি হওয়ার পনের দিন আগেও S দুবেলা কাজে এসেছে। ডেলিভারি হওয়ার এক মাস পরে আবার S কাজে ফিরে এল। সবাই মিলে তাকে অভ্যর্থনা জানানো হল আমাদের ইউনিয়ন হলে। গান গাওয়া হলো। কেক কাটা হল ওর অনারে।

কয়েক বছর কেটে গেল। এর মধ্যে আস্তে আস্তে বয়ফ্রেন্ড আবার ফিরে এসেছে, বাচ্চা মেয়েটা এখন পাঁচ বছরের। S আরো দায়িত্ব নিয়েছে, আমার থেকেও বেশি রোজগার করে বোধহয় এখন, প্রতি এক কি দু’ বছর অন্তর গাড়ি চেঞ্জ করে। আগেরটা ছিল বি এম ডাবলুউ, এবার দেখলাম একটা বিরাট কালো মার্সিডিস চালাচ্ছে। আমাকে মাঝে মাঝে নিউ ইয়র্ক ফেরার ট্রেন ধরিয়ে দেয় প্রবলবেগে গাড়ি চালিয়ে ঠিক সময়ে। আমি ভয় পেয়ে সীট আঁকড়ে ধরলে হাসে। বলে, "ভয় পেও না। আমি ভালো ড্রাইভার। পনের বছর বয়েস থেকে গাড়ি চালিয়ে কাজে যাচ্ছি।"

বিয়ে করেনি ওরা। কিন্তু খুব ভালো আছে। প্রচন্ড কর্তব্যজ্ঞান। অদ্ভূত সময়ানুবর্তিতা। আমাদের এই এডুকেশন সেন্টারে মাছি পিছলে যায়। প্রত্যেক কর্মচারী ওর অধীনে ঘড়ির কাঁটার মত কাজ করে। আরও কর্মচারীর সংখ্যা বেড়েছে। এর ওপর এখন S আবার কনফারেন্স সেন্টারের ঘরগুলোতে সব ইলেকট্রনিক ইকুইপমেন্ট ঠিকমত চলছে কিনা, তার দেখাশোনা করে। সঙ্গে একজন আই টি। আমার ক্লাসের শুরুতে প্রতিবার আমাকে ইন্ট্রোডিউস করে দেয়।

শুনছি S নাকি আবার প্রেগন্যান্ট। এপ্রিল না মে মাসে ওর আবার বেবি হবে।

S-কে কোনদিন রাগতে দেখিনি। সব সময়ে দেখেছি সৌজন্য, পেশাদারিত্ব। বন্ধুত্ব। সহকর্মীদের নিয়ে কীভাবে কাজ করতে হয় নিখুঁতভাবে, তার একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হল এই ছোট্টখাটো চেহারার মেয়েটা। কলেজের একটা ডিগ্রি আছে চার বছরের। মনে খুব ইচ্ছে একদিন এম এ করবে। মাঝে মাঝে বলে, "পার্থ, তোমাকে দেখে আমার খুব অনুপ্রেরণা জাগে। ওঃ, তুমি পি এইচ ডি, আর আমি একটা মাস্টার্সও করতে পারলাম না।"

আমি মনে মনে বলি, "তোমার জীবনের শিক্ষা তোমাকে যে জায়গায় নিয়ে এসেছে, আমার মত দশটা পি এইচ ডি-ও সেখানে কোনদিন পৌঁছতে পারবেনা।"

 

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -