SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali

‘ভালবাসার শহর’ -এর উপরে চোখ রাখে ত্রিকালদর্শী ক্যামেরা

জুলাই ৪, ২০১৭
Share it on
‘‘এবার মনে হয় ‘এবেলা ডিজিটাল’ আর ইন্দ্রনীলদের হাত ধরে, অন্তত বাংলা ছবির ভূগোলে, সীমান্তের কাঁটাতার টপকানোর পালা শুরু হলো।’’ জানালেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট আলোচক আলম খোরশেদ।

ইউটিউবে ঘোরাঘুরির তেমন অভ্যাস নেই। ফেসবুকে ভেসে আসা ভিডিও-র লিঙ্কগুলোকেও সভয়ে এড়িয়ে চলি। ফলত, বাংলা সিনেমার জগতে যে একটি অবিশ্বাস্য অথচ সুদূরপ্রসারী ঘটনা ঘটে গেল মাত্র ক’টা দিন আগে, তার খবরটা পেতে একটু দেরিই হয়ে গেল! বলছিলাম, অবাণিজ্যিকভাবে, স্রেফ আন্তর্জালিক পরিসরে সদ্য মুক্তি-পাওয়া ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরীর মুক্তদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, ‘ভালবাসার শহর’-এর কথা।

এতকাল আমরা ডক্টরস উইদাউট বর্ডার, লইয়ারস উইদাউট বর্ডার এসবের কথা শুনেছি, এবার মনে হয় ‘এবেলা ডিজিটাল’ আর ইন্দ্রনীলদের হাত ধরে, অন্তত বাংলা ছবির ভূগোলে, সীমান্তের কাঁটাতার টপকানোর পালা শুরু হলো; সিনেমা সাঁ ফ্রন্তিয়ের! আত্মীয়-বান্ধবদের কাছ থেকে ধারদেনা করে কায়ক্লেশে একটা ছবি তবু বানিয়ে ফেলা যেতে পারে, কিন্তু বিশ্বব্যাপী সিনেমা পরিবেশকদের যে দুর্জ্ঞেয় ও দুর্ভেদ্য চক্র, তার সঙ্গে মোকাবেলা করে সেই ছবিটিকে আরাধ্য দর্শকের কাছে নিয়ে যাওয়াটাই এখন পর্যন্ত, অন্তত নবীন চলচ্চিত্রকারদের কাছে, একটা মস্ত চ্যালেঞ্জ। এবার তা হলে তার একটা সুরাহা হল; নির্মাতারা পরিবেশক, হল-মালিক— এদের কারও তোয়াক্কা না করে চাইলে সরাসরি তাদের ছবি ইন্টারনেটের উন্মুক্ত মঞ্চে ছেড়ে দিতে পারেন। ছবি ভাল হলে লোকে দেখবে, সিনেমা হলের চেয়ে বেশি মানুষই দেখবে, এতে কোনও সন্দেহ নেই।

কিন্তু তার পরেও ছবির লগ্নি, তা সে যে-অঙ্কেরই হোক না কেন, তুলে আনার ব্যাপারটা তো থেকেই যাচ্ছে। এ-ক্ষেত্রেও ভালোবাসার শহর-এর পরিচালক ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী যে-পন্থার আশ্রয় নিয়েছেন, হালের ভাষায় যাকে বলা হয়ে থাকে ‘ক্রাউড ফান্ডিং’, সেটি একটি সম্ভাব্য, গ্রহণযোগ্য ও সফল উপায় হতে পারে। (এইখানে জনান্তিকে জানিয়ে রাখি, এই লেখকও কিন্তু বছর তিনেক আগে, বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত এই ক্রাউড ফান্ডিং পদ্ধতিতেই, চট্টগ্রাম শহরে ‘বিস্তার’ নামে একটি আর্টস কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন।) ইন্দ্রনীলের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটা বরং তুলনামূলকভাবে কম, যেহেতু তিনি একটা তৈরি পণ্য ভোক্তার হাতে তুলে দিচ্ছেন, এবং সেটি সন্তোষজনক হলে যে-কোনও সংবেদনশীল মানুষই তার জন্য একটা মূল্য ধরে দিতে কার্পণ্য করবেন বলে মনে হয় না। আশা করি, ছবির শুরুতে পরিচালকের সুন্দর, সাবলীল আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ছবির শেষে উল্লেখিত পন্থায় যথোপযুক্ত সাড়াও দিচ্ছেন সচেতন দর্শকশ্রেণি।

• ভারত ও বাংলাদেশের দর্শকরা ‘ভালবাসার শহর’ ছবিটি দেখুন এখানে

 

গৌরচন্দ্রিকা ছেড়ে, এবার ছবির কথা কিছু বলি। সত্যি বলতে কী, ছবির নামটির মতো গল্পখানিও আমার কাছে তেমন মৌলিক কিংবা অভিনব মনে হয়নি, যদিও তা নিঃসন্দেহে খুব প্রাসঙ্গিক ও সময়োপযোগী। (ছবির নামলিপিতে ‘ভালবাসা’ শব্দটির বুক চিরে বেরিয়ে যাওয়া তীক্ষ রেখাটির অভিঘাত কিন্তু সাংঘাতিক!) তবে এই আপাত সাদামাটা গল্পটি বলার স্মার্ট, সমকালীন ও শিল্পিত ভঙ্গিটি খুব মনে ধরেছে আমার। চলচ্চিত্র যে মূলত ক্যামেরার কাব্য, সেটি এই ছবি দেখে আরও একবার টের পাওয়া গেল। এই ছবির অন্যতম শক্তির জায়গা হলো এর কুশীলবদের অনুচ্চ অথচ অভিব্যক্তিময় অভিনয়, পাশাপাশি অসংখ্য ইঙ্গিতময় ডিটেলের কাজ। প্রবীণ অরুণ মুখোপাধ্যায় কি নবীন ঋত্বিক চক্রবর্তীর কথা নতুন করে কিছু বলার নেই। তবে বিস্মিত করেছেন বাংলাদেশের জয়া আহসান, এমনই সূক্ষ্ম ও সাবলীল তাঁর অভিনয়; যে-কৃতিত্বের একটা বড় অংশ নিশ্চয়ই পরিচালকের পাওনা, কেন না এপারে তাঁর এই মাপের অভিনয় দেখে আমরা অভ্যস্ত নই। ছবির প্রধান কুশীলব, আদিল ও অন্নপূর্ণার মধ্যে আন্তর্ধর্ম বিবাহসম্পর্ক প্রদর্শন ও তার উপস্থাপনভঙ্গিটিও ভারতের এই মুহূর্তের সমাজরাজনৈতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ইঙ্গিতবাহী। সঙ্গীতায়োজনে মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীতযন্ত্রের উপস্থিতি এবং ছবির শুরুতে ও শেষে বাংলার বহুল পরিচিত লোকগীতির এমন বুদ্ধিদীপ্ত ও বহুমাত্রিক ব্যবহার ছবিটিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে।

বিদেশের দর্শকরা দেখুন ‘ভালবাসার শহর’ এই ভিমিও লিঙ্কটিতে, রেন্ট অপশনটি ক্লিক করে

সবশেষে, যে-কথা না বললেই নয়, তা হলো— গল্পের বুননে পরিচালক যেভাবে কোলকাতা ও সিরিয়ার হোমস শহরকে মিলিয়ে দেন, একের বেদনা চারিয়ে দেন অন্যের বোধে, তাকে করে তোলেন বিশ্বজনীন, তাও অত্যন্ত প্রতীকী এক গূঢ়তর ব্যঞ্জনায়, একটি শিশুর করুণতম মৃত্যুর মধ্য দিয়ে, তা তাঁর প্রগাঢ় রাজনীতি ও ইতিহাসচেতনার পরিচায়ক। তবে, ছবির একেবারে শেষ পর্যায়ে যখন হোমস শহরের ধ্বংসযজ্ঞের ওপর দিয়ে যখন তাঁর ত্রিকালদর্শী ক্যামেরা প্যান করে যাচ্ছিল তখন আর অই ধারাভাষ্যের মতো করে বাড়তি কথাগুলো যোগ না করলেই মনে হয় ভালো হতো। এহ বাহ্য, ইন্দ্রনীলের এই বহুস্তরী, সাহসী ও সীমান্তভাঙা, পথপ্রদর্শক ছবিটির জন্য রইল আমাদের সহস্র সেলাম।

(লেখক বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য ও শিল্প সমালোচক, চট্টগ্রামের ‘বিস্তার আর্টস কমপ্লেক্স’-এর কর্ণধার, এবং সে-দেশের নতুন সিনেমা আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী)

Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -