SEND FEEDBACK

English
Bengali
English
Bengali

এনআরএসে ময়লার গাদায় পাওয়া গেল আস্ত মানুষ!

নিজস্ব সংবাদদাতা | অগস্ট ১, ২০১৬
Share it on
হাসপাতালে চত্বরে আবর্জনার স্তূপে একজন আস্ত মানুষ পড়ে থাকলেও তা কেন কারও নজরে পড়ল না?

 বয়স ৭০। নাম সুপ্রিয় ঘোষ। বাড়ি পাটুলি থানা এলাকায়। 
বাড়ির ঠিকানা মনে নেই। কিন্তু গত প্রায় তিনদিন তাঁর ঠিকানা ছিল এন আর এস হাসপাতালে ময়লার গাদা! রবিবার সকালে সেখান থেকেই তাঁকে ‘উদ্ধার’ করা হয়েছে। আপাতত ওই প্রৌঢ় ভর্তি এন আর এস হাসপাতালেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্বীকার করে নিয়েছেন, এটা তাঁদের ‘ত্রুটি’। ত্রুটি এই যে, একটি সরকারি হাসপাতালে জঞ্জালের গাদায় একজন জলজ্যান্ত মানুষ পড়ে রইলেন প্রায় তিনদিন অথচ তা কারও নজরে এল না!
ঘটনাচক্রে, এ রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতরের প্রতিমন্ত্রী নিজেও পেশায় চিকিৎসক। শশী পাঁজা। ঘটনাচক্রে, রাজ্যে সরকারি হাসপাতালগুলির মূল দায়দায়িত্ব যাঁর কাঁধে ন্যস্ত, তাঁর নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যিনি রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী। যিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীও বটে। আরও ঘটনাচক্র, সাম্প্রতিককালে এই মমতাই তাঁর যাত্রাপথে দুর্ঘটনাগ্রস্ত এবং পরিত্যক্ত মোটরসাইকেল আরোহীকে নিজের গাড়ি থামিয়ে তুলে হাসপাতালে পাঠিয়েছেন! 
সেই মমতা-রাজত্বেই একটি সরকারি হাসপাতালের আস্তাকুঁড়ে প্রায় তিনদিন পড়ে রইলেন একজন অসুস্থ মানুষ। বিশেষ ‘সাফাই অভিযান’ না-হলে সম্ভবত আস্তাকুঁড়ে তাঁর পড়ে থাকার মেয়াদ আরও বাড়ত। 
পুলিশ এবং হাসপাতাল সূত্রের খবর, এদিন সকালে হাসপাতাল চত্বরে ‘সাফাই অভিযান’ শুরু হয়েছিল। সেই কাজ চলাকালীন ময়লা-আবর্জনার মাঝেই আচমকা প্রাণের স্পন্দন মেলে। সাফাইকর্মীদের চোখে পড়ে, আবর্জনার মধ্যে পড়ে রয়েছেন প্রবীণ সুপ্রিয়। দ্রুত তাঁকে সেখান থেকে তুলে এনে ওই হাসপাতালেরই জরুরি বিভাগে ভর্তি করানো হয়। আপাতত সেখানেই তিনি চিকিৎসাধীন। 
হাসপাতালে চত্বরে আবর্জনার স্তূপে একজন আস্ত মানুষ পড়ে থাকলেও তা কেন কারও নজরে পড়ল না?
এন আর এসের অধ্যক্ষ দেবাশিস ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘‘স্বীকার করে নিচ্ছি, এটা ত্রুটি! এদিনের ঘটনায় বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। ভবিষ্যতে এসব ক্ষেত্রে আমাদের আরও সতর্ক থাকার পাশাপাশি নজরদারিও বাড়াতে হবে। আমরা সেদিকেই লক্ষ্য রাখছি। হাসপাতালের সব অংশেই নজরদারি আরও জোরদার করা হবে। এদিনের ঘটনা থেকে আমরা শিক্ষা নিচ্ছি।’’ 
কী বলেছেন হাসপাতালের সুপার মণিময় বন্দ্যোপাধ্যায়?
তাঁর অবশ্য বক্তব্য, ‘‘তিনদিন পড়েছিলেন কি না তা বলতে পারব না। জায়গাটা চোখের আড়ালে। জরুরি বিভাগের পিছনে। ওখানে একটা গ্রিলের গেট আছে। সিঁড়ি আছে। সেখানেই উনি শুয়েছিলেন বলে জানা যাচ্ছে। আমরা শনিবারও ঘুরেছি। তিনদিন পড়ে ছিলেন, এটা ঠিক নয়।’’ তবে অন্য এক হাসপাতাল কর্তা স্বীকার করে নিয়েছেন নজরদারিতে ত্রুটির কথা। তিনি বলেন, ‘‘আমাদের হাসপাতালে অধিকাংশ জায়গাতেই নজরদারির জন্য কোনও সিসিটিভি বা নিরাপত্তাকর্মী নেই। ফলে কে কোথায় পড়ে আছেন বা স্থায়ী আস্তানা গেড়ে বসে পড়ছেন, তা জানা সম্ভব নয়। এদিন সাফাই অভিযান না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যে ওখানেই পড়ে থেকে মারা যেতেন, তাতে কোনও সন্দেহ নেই!’’ 
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এদিন সকাল সাড়ে ৮টা নাগাদ হাসপাতালের বিভিন্ন অংশে সাফাই অভিযান কাজ শুরু হয়। হাসপাতাল চত্বর ‘স্বচ্ছ’ রাখার লক্ষ্যে কর্তৃপক্ষ সাফাই কাজে ‘স্পেশাল ড্রাইভ’ দিয়েছিলেন। অভিযানের সময় সাফাইকর্মীদের সঙ্গেই হাসপাতাল চত্বরে হাজির ছিলেন সুপার এবং ডেপুটি সুপার। তাঁদের তত্ত্বাবধানেই শুরু হয় হাসপাতালের মধ্যে চারিদিকে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা নোংরা এবং আবর্জনা সাফাই। বেলা ১১টা নাগাদ সাফাইকর্মীরা পৌঁছন জরুরি বিভাগের পিছন দিকে। দীর্ঘদিনের জমা ময়লা সেখানে স্তূপাকৃতি হয়ে পড়েছিল। তাঁদের নজরে আসে, তার মধ্যেই কেউ একজন পড়ে আছেন। 
এক সাফাইকর্মী পরে বলেন, ‘‘আমরা প্রথমে মড়া ভেবেছিলাম। কাছে গিয়ে দেখি নড়ছে! বেঁচে রয়েছে!’’ ওই সাফাইকর্মীই জানান, জঞ্জালের গাদায় পড়ে-থাকা মানুষটির পরনে ময়লা ট্রাউজার্স আর ফুলস্লিভ শার্ট ছিল। হাতটুকু তোলার ক্ষমতাও ছিল না। কাছে যেতেই গোঙানির আওয়াজ পাওয়া যায়। অস্পষ্ট স্বরে মানুষটি কিছু বললেও তা বোঝা যায়নি। প্রথমে জানানো হয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। এন্টালি থানায়ও খবর দেওয়া হয়। হাসপাতালের পুলিশ আউটপোস্টের ওসি হাজির হন ঘটনাস্থলে। তারপর হাসপাতাল সুপারের তত্ত্বাবধানে জঞ্জালের স্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয় ধুঁকতে-থাকা আস্ত মানুষটিকে। সেখান থেকে সরাসরি তাঁকে জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়। শুরু হয় প্রাথমিক চিকিত্সা। পরে পাঠানো হয় মেডিসিন বিভাগে। 
জরুরি বিভাগের এক চিকিত্সক পরে জানান, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তি নিজের নাম সুপ্রিয় ঘোষ বলে জানিয়েছেন। পাটুলি থানা এলাকায় তাঁর বাড়ি বললেও ঠিকঠাক ঠিকানা বলতে পারেননি। গুরুতর অসুস্থতার কারণেই প্রৌঢ় সবকিছু ঠিকভাবে মনে করতে পারছেন না বলে চিকিত্সকদের ধারণা। টুকরো টুকরো কথার মধ্যেই তিনি জানিয়েছেন, গত তিনদিন ওই জঞ্জালের গাদায় পড়েছিলেন। জানিয়েছেন, তিনদিন কিছু খেতেও পাননি। চিকিৎসকদের একাংশের বক্তব্য, সুপ্রিয় জানিয়েছেন, তিনি এন আর এসে চিকিৎসা করাতে এসেছিলেন। আবার অন্য একাংশের প্রশ্ন, পাটুলিতে বাড়ি হলে এতদূরের এন আর এসে কেন আসবেন? 
এন আর এসের ডেপুটি সুপার দ্বৈপায়ন বিশ্বাস বলেন, ‘‘ওঁর দু’পায়ে ঘা ছিল। তার চিকিত্সা শুরু করা হয়েছে। অপুষ্টির ছাপ রয়েছে শরীর জুড়ে। তিনদিন কিছু খাননি বলে জানিয়েছেন। না-খাওয়ায় শরীরে জলশূন্যতা (ডিহাইড্রেশন) রয়েছে।’’ দ্বৈপায়নই জানান, সুপ্রিয় জানিয়েছেন, তিনি অকৃতদার। পাটুলিতে মামারবাড়িতে থাকতেন। অভিযোগ করেছেন, ক’দিন আগে তাঁকে বাড়ি থেকে বার করে দেওয়া হয়েছে। 
হাসপাতালের সুপার মণিময় বলেন, ‘‘আমরা ওঁর চিকিত্সা এবং যত্নের ব্যবস্থা করেছি। আশা করা যায়, উনি সুস্থ হয়ে উঠবেন।’’ অধ্যক্ষ দেবাশিস বলছেন, ‘‘সম্প্রতি দায়িত্ব নিয়েই সুপার ওই মানুষটিকে উদ্ধার করে যেভাবে চিকিত্সার ব্যবস্থা করেছেন, তা প্রশংসনীয়। এটা একটা মানবিক প্রয়াস। ভবিষ্যতে হাসপাতাল চত্বরে কোনও মানুষ, ভবঘুরে বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি যাতে এভাবে বিনা চিকিত্সায় পড়ে না থাকেন, সে বিষয়েও আমরা সতর্ক থাকব এবং পদক্ষেপ করব।’’ 

Mamata Banerjee NRS Hospital Supriyo Ghosh
Share it on
Community guidelines
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -