SEND FEEDBACK

English
Bengali
English
Bengali

‘যা গরম পড়েছে না বৌদি! একেবারে পাগল করে দেবে!’

অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়, এবেলা.ইন | মে ১৯, ২০১৭
Share it on
লাইনে দণ্ডায়মান পাবলিকের দাবি, তাঁরা সকলেই কিয়স্কে দাঁড়িয়ে ট্রাফিক সামলাবেন। পুলিশ কি এই উন্মার্গগামী স্বেচ্ছাসেবীদের ইন্ডারভিউ নেয়?

এই লেখার শিরোনাম স্বর্গত রসসাহিত্যিক তারাপদ রায়ের ‘কাণ্ডজ্ঞান’ নামক মহাগ্রন্থের ‘পাগলের কাণ্ডজ্ঞান’ নামক একটি লেখার থেকে ধার করা। সেই লেখায় এমনটাই ছিল— এক দুর্মদ গ্রীষ্মের দুপুরে এক মহিলা কোনও এক রেল স্টেশনের ওভারব্রিজ পার হচ্ছেন। এমন সময়ে তাঁর বিপরীত দিক থেকে উঠে এল এক ব্যক্তি। সম্পূর্ণ উলঙ্গ, মাথায় একটা ডাবের খোলা, গলায় একটা ছেঁড়া গামছা কাউবয়দের রুমালের কেতায় বাঁধা। শনৈ শনৈ সে এগিয়ে আসছে আর মহিলা প্রমাদ গণছেন। কী হয় কী হয় কী জানি কী হয়! এমন সময়ে সেই উলঙ্গ উন্মদ মহিলার সামনে। মহিলা স্থির, আসন্ন মৃত্যুর অপেক্ষায় চিত্রার্প্ত। কিন্তু...। কিছুই ঘটল না। উন্মাদ তার গলায় বাঁধা গামছায় মুখের ঘাম মুছে মিষ্টি হেসে মধুর স্বরে জানাল— ‘যা গরম পড়েছে না বৌদি! একেবারে পাগল করে দেবে।’

উপরের উদ্ধারে কিঞ্চিৎ রং চড়েছে। এর জন্যও ক্ষমা চাইছি। তবে এ দায় আমার নয়, গরমে সবই যাকে বলে বাড়াবাড়ি। কলকাতার গরমে যখন এমন ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা, তখন রাঢ়ের কথা একবার ভাবুন। বাংলার এই অতিপ্রাচীন ভুক্তিতে উন্মাদনা একটা কমন বিষয় বলেই পরিগণিত। বাঁকুড়া-পুরুলিয়ায় ‘ক্ষ্যাপা’ হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের অনেকেই সিজন্যাল। মে মাসে এঁরাই গাছে উঠে পড়েন যখন তখন, হাতে ঢিল নিয়ে দৌড়োদৌড়ি করেন, তারস্বরে গেয়ে ওঠেন বেসুরো গান। কিন্তু আকাশে বর্ষার মেঘ জমলেই এঁদের ব্রহ্মতালু জুড়োতে শুরু করে। পুজো নাগাদ এঁরা রীতিমতো গম্ভীর। আর শু‌শুনিয়া-বিহারীনাথের চুড়োয় হিম পড়তে শুরু করলে এঁরা একেবারেই নর্মাল। গ্রীষ্মে এঁরা কী কাণ্ড করে বেড়িয়েছিলেন, তা তাঁদের দেখে আঁচ করাও যাবে না।

রাঢ়ের এই সিজন্যাল ক্ষ্যাপামি থেকে কলকাতা মুক্ত। এখানে বেশিরভাগ পাবলিকই পার্মানেন্ট পাগল। কেবল গরমে এঁদের তৎপরতা সাংঘাতিকভাবে বেড়ে যায়। টালা ব্রিজ বা বিজন সেতুর রেলিংয়ে ঘন ঘন লেখা বাড়তে থাকে— ‘সূর্য পৃথিবীর চার পাশে ঘোরে’। মেট্রো রেলের স্টেশনের গায়ে চুন দিয়ে লেখা অঙ্কের পরিমাণও বেশি বলে মনে হয়। রাস্তায় ট্রাফিক কন্ট্রোলের জন্য লাইন লেগে যায়। পুলিশও সে লাইন সামলাতে পারে না। লাইনে দণ্ডায়মান পাবলিকের দাবি, তাঁরা সকলেই কিয়স্কে দাঁড়িয়ে ট্রাফিক সামলাবেন। পুলিশ কি এই উন্মার্গগামী স্বেচ্ছাসেবীদের ইন্ডারভিউ নেয়? কে জানে। তবে উত্তর শহরতলির টবিন রোড-বিটি রোড ক্রসিংয়ে যে কিংবদন্তিপ্রতিম জ্যাম হয়, তার মূলে নাকি থাকে ওই সব ঊর্ধ্ববায়ু ‘হুলালা’-দের অবদান। আর মে-জুন মাসে সেই জ্যামের প্রকোপ খানিকটা বেশিই থাকে। সুতরাং অনুমান করা যেতেই পারে, ‘হুলালা’-দের সংখ্যা অথবা গুণগত উৎকর্ষ— দুই-ই গরমে বেড়ে গিয়েছে।

রাতের স্টেশন চত্বরে, পাড়ার ছিপা গলির আঁধার কানাচে খাপ পেতে থাকেন কেউ কেউ। রাস্তা শুনশান হলেই তাঁরা সেঁধিয়ে যান এটিএমগুলোয়। পাগল বলে ওঁদের কি এসি-র প্রয়োজন নেই? কিন্তু রাতটহলের পুলিশের মন মানে না। তাঁরা এটিএম-এর কুহর থেকে টেনে বের করেন এঁদের। চড়টা-চাপড়টাও চালান। রাত দুটোয় যদি কানে আসে পুলিশের উচ্চকণ্ঠ— ‘তোর বাপ কোনও দিন এসি-তে শুয়েছে!’ তখন নেমে এসে আপনি যুক্তি দিতেই পারেন, এদেশের ঘাড় থেকে কি আজও বংশানুক্রমের ভূত নামল না। তাতে আদৌ কোনও লাভ হবে না। আইনরক্ষকরা যে কেন পাগলের পিছনে পড়ে থাকেন, তা জানা যায়নি আজও।

পাগলরা কি আইন ভঙ্গকারী? তাহলে ট্রাফিক আইন রক্ষার জন্যে তাদের এত আগ্রহ কীসের? গ্রীষ্মের এই দাবদাহে তাদের আগ্রহ কোন দিকে ঝোঁকে— আইনরক্ষা, নাকি আইন ব্রেক? এইসব বেসিক প্রশ্নের উত্তর শত চেষ্টাতেও পাওয়া যায় না।

এদিকে কলকাতার রাস্তায় এক সাঁজোয়া গাড়ি টহল দেয়। গায়ে লেখা— ‘স্পেশালাইজড ফোর্স’। স্টিয়ারিং-এ এক লড়াইখ্যাপা চেহারার লোক বসে। সেই গাড়ি ধাঁ ধাঁ করে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ দিয়ে যাতায়াত করে। তার নম্বর সাধারণ গাড়ির মতোই। তার গায়ে কোথাও ‘পুলিশ’ বা ‘আর্মি’ লেখা নেই। চালক মশাই সুযোগ পেলেই অন্য গাড়ির চালকদের সঙ্গে গায়ে পড়ে ঝামেলা বাধান। তাঁর একটাই বাক্য— ‘আমাকে চিনিস! আমি কি করতে পারি জানিস!’ এর থেকে বেশি কেউ কেনওদিন তাঁর মুখে থেকে নিঃসৃত হতে শোনেনি। এই সব কাজিয়েয় পুলিশ কখনই জড়ায় না। কারণ, আর কেউ না জানুক, তারা জানে, এই স্পেশালাইজড ফোর্স ব্যাপারটা প্রতীকী।

এই পুঙ্গব কি কলকাতার যাবতীয় গ্রীষ্মপাগলের প্রতিভূ? নিদাঘশাসিত গ্রীষ্মের অরুন্তুদ হাহাকার কি এক বিশেষায়িত সেনাবাহিনি গড়ে তুলতে প্রাণীত করেছে কলকাতার গ্রীষ্মপাগলদের? এই লড়াইখ্যাপা ভদ্রলোক কি সেই বাহিনীর জিওসি ইন সি? কী চাইছে এই অদৃশ্য সেনা? কোন অন্তর্ঘাত ঘনিয়ে রয়েছে এই মলবাজ, ধান্দাপ্রাণীত, বাতেলাপ্রবণ, মিডিয়াখোর শহরের শিয়রে, তা জানা যায় না। প্রতি বছর গ্রীষ্মেই এই সব প্রশ্ন পাক খায় মনের ভিতরে। কিন্তু তাদের উত্তর খোঁজার আগেই ঘনিয়ে ওঠে কালবৈশাখী। উড়তে থাকে শুকনো শালপাতা, পলিথিন আর ছেড়া খবরের কাগজ। বৃষ্টি নামে। দেবব্রত বিশ্বাসের গলা বেজে ওঠে ট্রাফিক সিগন্যালে— ‘বহুযুগের ওপার হতে আষাঢ় এলো’।

আমরা ভুলে যাই, কী হয়েছিল গতকাল। আগামীকালও কিছু ঘটবে কি? আবার একটা গ্রীষ্ম ক্যালেন্ডারে উঁকি দেয়। আবার শুরু হয় তৎপরতা। খেলা ঘোরে। চক্রাকারে ঘুরতেই থাকে।         

Mad Kolkata Lunacy Crazy
Share it on
Community guidelines
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -