SEND FEEDBACK

English
Bengali

উত্তরসূরীর খোঁজে রয়েছেন শহরের একমাত্র মহিলা পুরোহিত

অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়, এবেলা.ইন | মে ১৯, ২০১৭
Share it on
তথাকথিত সামাজিক শ্রমবিভাজনের গপ্পো মেনে আপনাদের সামনে অনাদি কাল থেকেই খাড়া করা হয়েছে একটা বিশেষ ছক। এই পেশা পুরুষের আর এইটা নারীপৃথিবীর ডোমেইন—

অভ্যস্ত চোখে ধাক্কা লাগতে বাধ্য। বিয়েবাড়ির বাকিটা হয়তো আপনার পরিচিত। স্বজন-সমাবেশ, আপ্যায়ন, উপহার, প্যান্ডেলের এক পাশে সদ্য আলাপ হওয়া বরযাত্রী কিশোরীটির লাজুক চাহনিকে গ্রহণ করা কনেপক্ষের যুবাটির কম্পিত অন্তর থেকে শুরু করে লুচি ভাজার গন্ধ পর্যন্ত একেবারেই চেনা। কিন্তু বিবাহ মণ্ডপে গিয়ে দেখতে পেলেন, আপনার চিরচেনা বিয়ের আয়োজন একেবারেই ‘ভিন্ন রকম’। তার উপরে পুরোহিত মশায়ের আসনে বসে রয়েছেন এক ব্যক্তিত্বময়ী মহিলা। আপনার অভ্যস্ত চোখে ধাক্কা লাগতে বাধ্য।

আসলে তথাকথিত সামাজিক শ্রমবিভাজনের গপ্পো মেনে আপনাদের সামনে অনাদি কাল থেকেই খাড়া করা হয়েছে একটা বিশেষ ছক। এই পেশা পুরুষের আর এইটা নারীপৃথিবীর ডোমেইন— এমন একটা অলিখিত ধারণা জ্ঞানোন্মেষণের কাল থেকেই মাথার ভিতরে ঢুকিয়ে দেয় পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান। তার পরে সেই ধারণাটাকেই বহন করতে করতে কেটে যায় জীবন। প্রশ্ন করা হয়ে ওঠে না, কেন এমন হবে। বহতা জীবনের কোনও এক বাঁকে যদি চোখে পড়ে চেনা ছকটা কোথাও টাল খাচ্ছে, তখন বিস্মিত হতে হয়। কোথাও আবার বিস্ময়কে টপকে উঠে আসে ‘প্রতিবাদ’। কেন এমন হবে? 

পুরুষের পেশায় নারীর প্রবেশকে এমন ভাবেই দেখেছে সমাজ। সব দেশে সব কালেই নারীকে পুং-পেশায় স্থিত হতে বিরাট সংগ্রাম করতে হয়েছে। সে দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ের পশ্চিমি দুনিয়ায় নারীর কর্পোরেটে প্রবেশই হোক আর ১৯ শতকের কলকাতায় কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়ের ডাক্তার হয়ে ওঠার গল্পই হোক, সব জায়গাতেই সংগ্রাম দারুণভাবে দৃশ্যমান। বিস্তর সামাজিক রিফর্ম আর প্রগতির কাহিনির ঘোলাজল পেরিয়ে এসে আজও দেখা যায়, এই ‘শ্রমবিভাজন’-এর কাহিনিটি তার নিজের মহিমায় বহাল রয়েছে। আজও পুং-পেশায় কোনও নারীকে দেখলে আমাদের চমক লাগে। কেউ বিষয়টিকে এড়িয়ে যাই। কেউ চেষ্টা করি, কেন এমন হবে বলে প্রশ্ন তুলতে। 

পৌরোহিত্য ব্যাপারটা তেমনই। প্রজন্ম পরম্পরায় আমরা পুরোহিত বলতে পুরুষকেই বুঝেছি। এমনকী, আমাদের ছোটবেলার ব্যাকরণের সিলেবাসে ‘লিঙ্গ পরিবর্তন’ চ্যাপ্টারে ‘পুরোহিত’ শব্দটাও ছিল কি না সন্দেহ। সেখানে যদি জ্বলজ্যান্ত একজন নারীকে পৌরোহিত্য করতে দেখা যায় কোনও বিবাহবাসরে, সেক্ষেত্রে একটু থমকে দাঁড়াতে হয় বই কি।

এই কথাগুলোই মনে আসছিল নন্দিনী ভৌমিকের সঙ্গে আলাপের সময়ে। ২৬ বছর অধ্যাপনা করার পরে এই মুহূর্তে তিনি পুরোহিত। পেশা কি বলা যায় একে? কলেজে পড়ানোকালীনই শুরু করেছিলেন পৌরোহিত্য। তখন সেটা ছিল প্যাশন। আজ যখন সাম্মানিক নেন পৌরোহিত্যকর্মের বিনিময়ে, তখন এটাকে ‘পেশা’-ই বলতে চান তিনি। আড়াই দশকেরও বেশি সময় ধরে কলেজে সংস্কৃত পড়াতে পড়াতে মনে হয়েছিল, নিখাদ সময় নষ্ট হচ্ছে। নিজের পড়াশুনো হবে কখন? ৬০ বছর বয়সে অবসর পর্যন্ত অপেক্ষা করাটা মূর্খামি বলে মনে হয়েছিল। ভিআরএস-এর আবেদন করায় যখন কলেজের গভর্নিং বডি সেটা মেনে নিল, তখন কোথাও একটা মু্ক্তির আস্বাদন ছিলই। 

এমনই এক সময়ে গৌরী ধর্মপালের সঙ্গে যোগাযোগ। লেডি ব্রেবর্ন কলেজের প্রাক্তনী নন্দিনী একটি পুনর্মিলন উৎসবের নিমন্ত্রণ করতে গিয়েছিলেন এই বিরল প্রতিভাময়ী বিদুষীকে। বেদ-বিশেষজ্ঞা গৌরী ধর্মপাল ততদিনে নিজে পৌরহিত্য করে সাড়া ফেলে দিয়েছেন। আলাপ ঘনিষ্ঠ হলে তিনি জানান, তাঁর উত্তরসূরীর সন্ধানে রয়েছেন তিনি। তখন গৌরীদেবীর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘পুরোনূতন বৈদিক বিবাহ’ প্রকাশিত হয়েছে। গৌরীদেবীর আহ্বানে সাড়া দিতে গিয়ে পাশে পান সহপাঠিনী রুমা রায়কে। গৌরীদেবীর প্রাথমিক উপদেশ ছিল— উচ্চগ্রামে সঠিক স্বরে উচ্চারিত হলে মন্ত্র ফলবতী হয়। পুরোহিতকে পুরুষ হতেই হবে, এমন কথা বেদ-এর কোথাও বলা নেই। সেই সঙ্গে একথাও বলা নেই যে, পুরোহিতকে ব্রাহ্মণ হতে হবে, ভারতীয় হতে হবে। পৌরহিত্য করতে গেলে যেটা সর্বাগ্রে প্রয়োজন, সেটা মন্ত্রের সঠিক উচ্চারণ এবং অর্থ বুঝে মন্ত্রোচ্চারণ। 

দেখুন ভিডিও

অনুপ্রাণীতা দুই নারীকে পৌরোহিত্যে দীক্ষা দিলেন গৌরী ধর্মপাল। মাস দু’য়েক কঠোর অভ্যাস চলল। গৌরীদেবী জানালেন, ঋগ্বেদ-এর দশম মণ্ডলের বিবাহসূক্তেই রয়েছে আমাদের পরম্পরাগত বিয়ের মন্ত্র। আশ্চর্যের বিষয়, এই মন্ত্রগুলি কোনও পুরুষের লেখা নয়। সূর্যা নামে এক নারীই রচনা করেছিলেন সেগুলি। গৌরীদি প্রতিটি মন্ত্রের বাংলা ও ইংরেজি তরজমা করলেন। তিনি কবি ছিলেন। সেই অনুবাদগুলোও হল অপূর্ব কাব্যসুষমামণ্ডিত। শুরু হল বিবাহবাসরে রুমা রায় ও নন্দিনী ভৌমিকের পুরোহিত হিসেবে যৌথ উপস্থিতি।

প্রথমে কম, কিন্তু পরে বাড়তে লাগল পৌরোহিত্যের আমন্ত্রণ। মূলত বিবাহদানের আমন্ত্রণই আসতে থাকে। গৌরিদেবীর শেখানো ‘পুরোনতুন বৈদিক বিবাহ’-কেই বাস্তবায়িত করতে থাকেন নন্দিনী ও রুমা।

কী রয়েছে বৈদিক বিবাহে? কোথায় এই বিবাহ, আমাদের চেনা বিয়ের রীতি-রেওয়াজ থেকে আলাদা? নন্দিনী জানালেন, বৈদিক বিবাহ অনেকটাই অন্যরকম। মূলযজ্ঞ আর সপ্তপদী, লাজাঞ্জলি, সিঁদুরদান ছাড়া তেমন কিছুই নেই এই বিবাহ অনুষ্ঠানে। বৈদিক বিবাহের আসরে গানের উপস্থিতি ছিল অনিবার্য। গৌরীদেবী শুরু করেছিলেন বিবাহ মণ্ডপে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়ার রীতি। প্রতিটি ক্রিয়ার সঙ্গে উপযোগী রবীন্দ্রগান— • হোমাগ্নি প্রজ্জ্বলনের সময়ে ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’
• বর-কনের হাতে হাত রেখে শপথগ্রহণের কালে ‘আমরা দু’জনা স্বর্গ খেলনা’, ইত্যাদি।

এই কাঠামোটাকেই আজও অনুসরণ করে চলেছেন নন্দিনী এবং রুমা। আগে নিজেরাই গান গাইতেন। কিন্তু কোথাও যেন সেখানেও নৈপুন্যের প্রয়োজন অনুভব করলেন। গৌরীদেবীও মত দিলেন ব্যাপারটার মধ্যে বল আনার বিষয়ে। রবীন্দ্রগানের খ্যাতনামা শিল্পী মনোজ মুরলী নায়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও বিরাট উৎসাহ দেখালেন। এমনকী নন্দিনীর নিজের মেয়ের বিয়েতেও মনোজ স্বয়ং গান বেছেছেন, গেয়েছেন। 

এক সময়ে গৌরীদেবী বলেছিলেন, বিনা পারিশ্রমিকে কাজটা করা চলবে না। পারিশ্রমিক ছাড়া কাজের মূল্য থাকে না। সেই নির্দেশকে মান্যতা দিয়েই পারিশ্রমিক নেন নন্দিনী ও রুমা। পারিশ্রমিকের একাংশ তাঁরা দান করেন কোনও অনাথ আশ্রমে। 

আজ আর একটা দু’টো নয়, বছরে বেশ কয়েকটি বিয়ে দেওয়ার ডাক পান এই নারী পুরোহিত যুগল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু কিছু বদলও এনেছেন অনুষ্ঠানে। তবে বিবাহ-মন্ত্রের তরজমাটা অবশ্যই অপরিবর্তিত রেখেছেন। সামাজিক অনুষ্ঠানে অবাঙালি কেউ থাকলে ইংরেজি তরজমাও বলেন বাংলার সঙ্গে সঙ্গে। 

বিয়ে ছাড়াও অন্নপ্রাশন, গৃহপ্রবেশ, শ্রাদ্ধ সম্পন্ন করেছেন নন্দিনী ও রুমা। উপনয়ন প্রদানের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন এখন। তবে এই মুহূর্তে যে ডাক বার বার আসছে, তা দুর্গাপুজোর। এবছর সরস্বতী পুজো করেছেন নন্দিনী। বেশ খাটাখাটনি করেই একটা স্ক্রিপ্ট লিখে ফেলেছিলেন। তার পরে মন্ত্র-হোম-গান। দেবী সরস্বতীর প্রাচীন রহস্যময় কাল্ট যেন উদ্বাসিত হয়ে উঠেছিল সেই পূজায়। তিন স্বরগ্রামে উচ্চারিত বৈদিক মন্ত্রের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল সমিধাগ্নির ঘ্রাণ। সরস্বতী প্রতীকের অন্তরালে যেন জেগে উঠেছিল আদিবৈদিক সংস্কৃতির প্রাণস্রোত সরস্বতী নদীও। মানব দেহে প্রবাহিত সরস্বতী স্বরূপা সুষুম্নাও কি কম্পিত হয়েছিল তখন, যখন বৈদিক মন্ত্রের সঙ্গে উচ্চারিত হল রবীন্দ্রসুর— ‘এবার তোর মরা গাঙে বান এসেছে, জয় মা বলে ভাসা তরী’? উত্তরে রহস্যময় হাসি হাসলেন নন্দিনী, শহর কলকাতার বুকেই বিরল পেশায় নিযুক্তা এক নারী। নাকি, বহুযুগের ওপার হতেই সে হাসি হাসলেন ঋগ্বৈদিক নারী সূর্যা? শহরের অলক্ষে তখন সময় স্থান বিনিময় করছে। কলকাতার নগরালি বদলে যাচ্ছে পঞ্চনদের কালে।

Nandini Bhowmick Priestess Kolkata
Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -